শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১২ ডিসেম্বর ২০২২, ২:০৩ অপরাহ্ণ

‘ আন্দোলন-সংগঠনে সঙ্কট : দায় ,দায়িত্ব ও সাফল্য ” (১)

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ১২, ২০২২ ২:০৩ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

সিরাজুল ইসলাম শাহীন:

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি আন্দোলন সংগঠিত হয়। সমস্যার পাহাড় দলে তাকে এগিয়ে যেতে হয়। যাত্রা পথের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ; পরিপক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে হয় পাথেয়। প্রতিপক্ষের বাধা – প্রতিবন্ধকতা অনেকটা তাই শাপে বর হয়ে ওঠে। কিন্তু সঙ্কট তৈরী হয় অভ্যন্তরীন দুর্বলতায়। যা কাঠের ঘরে উইপোকার মত ভিতর থেকে সর্বনাশ করে দেয়। আদর্শের পতাকাবাহীদের জন্য রক্ষা কবচ সংগঠনের ”মেজাজ ও পরিবেশ ” যথার্থ সংরক্ষন। এর দায় ও দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলের। পরিপূর্ন সচেতনতাই অতন্দ্র প্রহরী। সঙ্কট সমাধানে দক্ষতা লক্ষ্য অর্জনে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। ক্রসেডের ইতিহাসে মহাবীর সালাউদ্দিন আইয়ুবী (র:) -র মহান বিজয়ের অন্যতম রহস্য এখানেই নিহিত রয়েছে।

মানুষ – মানবিক দুর্বলতা নিয়ে যার বসবাস। মানুষের সংগঠনে ত্রুটি -বিচ্যুতি – ঘাটতি থাকবেই। রোগ – চিকিৎসা নিয়ে যেমন আমাদের জীবন চলে তেমনি সংগঠনে ভুল-গুলো সংশোধন করে এগিয়ে যাওয়াই গতিশীলতা। ইসলামী সংগঠন তথা দাওয়াতে দ্বীনের কাফেলার জন্য এ ক্ষেত্রে মৌলিক অবলম্বন হচ্ছে তাকওয়া। মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদিস এখানে প্রণিধান যোগ্য , ” হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা পোষণ করো না , ঘৃণা বিদ্বেষ পোষণ করো না ,পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। কেউ কারও উপর ক্রয় -বিক্রয় করো না। আল্লাহর বান্দাগণ ভাই ভাই হয়ে থাকো। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তাকে জুলুম করতে পারে না, অপমান অপদস্ত করতে পারে না ,এবং তুচ্ছ জ্ঞান করতে পারে না। তাকওয়া এখানে – এ কথাটি তিনি তিনবার বলে নিজের বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করলেন। কোন ব্যক্তি খারাপ প্রমাণিত হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে , সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। প্রত্যেক মুসলিমের জীবন , ধন -সম্পদ ও মান -সম্মান অন্য সব মুসলিমের জন্য হারাম।(বাবু তাহরিমি যুলমিল মুসলিম , ৮৬৫০)

আপোষহীনতা একটি মৌলিক গুণ। যুদ্ধ্বের ময়দানে এবং আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ়তা অপরিহার্য। মক্কার কঠিনতম সময়ে কুরাইশদের অতি লোভনীয় প্রস্তাব মুখের উপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল (সূরা কাফিরুনের শানে নুযুল দ্রঃ)। বদর -ওহুদ -খন্দক সহ বাতিলের সাথে প্রতিটি ময়দানে যা ছিল কার্যকর। কিন্তু জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনের ক্ষেত্রে কি ? সমঝোতাই এখানে একমাত্র কাংখিত সমাধান। জলিল-কদর সাহাবায়ে কেরামগণের উপস্থিতিতেই সে চেষ্টা হয়েছিল। মতভিন্নতার ক্ষেত্রে চরম প্রান্তিকতা থেকে স্থায়ী বিভেদ তৈরী হয়। যা অনাকাঙিত ও বেদনাদায়ক। নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবসান করে এক হয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে সফলতা। এর কৃতিত্ব যেমন নেতৃত্বের তেমনি ব্যর্থতার দায়ও অবধারিত । মনকে বড় ও উদার করতে হয়। ক্ষমা অনেক সময় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। হযরত হাতিব ইবনে আবি বালতায়া (রা:) – কে রাসূলুল্লাহ (স:) – ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতিকালীন কুরাইশদের নিকট গোপনে চিঠি পাঠানোর সময় ধৃত হন । প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর (রা:) তাঁকে মিশরের অধিপতি মাকুকাসের দরবারে পাঠান এবং একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন । তাহলে একই আদর্শের – সংগঠনের দীর্ঘ দিনের সাথী – বন্ধুদের ক্ষমা করা যাবে না কেন ?

সঙ্কট একদিনে হয় না। দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম , প্রশ্রয় ও ভুলধারনা থেকে ক্ষোভ -লোভ -হিংসা -বিদ্বেষ ছড়িয়ে পরিবেশ কলুষিত হয়ে উঠে। সকল কার্যকরী সদস্যদের এর নৈতিক দায় রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহ ও নিজস্ব ভূমিকা – আচরণের নির্মুহ বিশ্লেষণ পূর্বক আত্বপর্যালোচনা জরুরী। কোন ভুল – বাড়াবাড়ি ধরা পড়লে অকপট স্বীকারোক্তি , ক্ষমা প্রার্থনা ও একান্ত তাওবা কাম্য। মনে রাখতে হবে ছলচাতুরি করে আপাত রক্ষা হলেও শেষ রক্ষা হয় না। আলেমুল গায়েব -সর্বজান্তা -আহকামুল হাকিমীন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বাঁচার কোন উপায় থাকবে না। মহিলা সাহাবী খাওলাহ বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ)- র পীড়াপীড়িতে হ্দ কার্যকরের সময় রক্তের ছিটা লাগায় জনৈক সাহাবী বিরক্ত হলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিরস্কার করেন এবং তাঁকে জান্নাতি মহিলা হিসাবে ঘোষণা করেন । জান্নাত কাম্য হয়ে থাকলে অনিয়মের সাথে জড়িতদের দ্রুততার সাথে ক্ষমা চাইতে বাধা থাকতে পারে না।

সিরিয়া বিজয়ের জন্য তুমুল যুদ্বরত অবস্থায় সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা:) খলিফা ওমর (রাঃ)-র পত্র পেয়ে নবনিযুক্ত সেনাপতি আবু ওবায়দা বিন জাররাহ (রাঃ) কে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে অনুরুধ করেন যুদ্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘোষণা না করতে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ব করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। যুদ্ব শেষে সবাই জানতে পারেন যে সেনাপতি পরিবর্তন হয়ে গেছেন। আনুগত্য -দায়িত্ববোধের এ নজরানা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের কুরবানী করে নতুনদের সাথে একাকার হয়ে সঙ্কট কাঠিয়ে অনন্য ইতিহাস রচনা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে কারও replacement হয় না কিন্তু ‘Chair makes man perfect’। দায়িত্ব দিলে নেতৃত্ব তৈরী হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুবক ওসামা বিন যায়েদ (রাঃ) কে সেনাপতি করে গিয়েছিলেন। সর্বস্থরের সাহাবায়ে কেরামগণের এতে কোন অসুবিধা হয়নি। অনেকে সময় নেই – ব্যক্তিগত অসুবিধার নানা অজুহাতে সরে থাকতে চান। এমন নাজুক মুহূর্তে নিজেদের ত্যাগ পেশে ব্যর্থতা সারা জীবনের আন্দোলনের অর্জন – বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ব করে তুলে ।

রাগ – বাড়াবাড়ি – ধৈর্যহীনতা – একগুঁয়েমি পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। ‘ওসোআসুল খান্নাস ‘ শয়তান ভাল করে জানে সংগঠনের স্বার্থ না দেখালে তা করাতে পারবে না। দ্বীনের স্বার্থের নামে অনাকাঙ্ঘিত মামলা , লজ্জাজনক অনলাইন প্রচারণা , বেপরওয়া গীবত , তুহমত -মিথ্যাচার নি:সন্দেহে আত্বঘাতী । শৃঙ্খলার নামে দায়িত্বের অপব্যাবহার – স্পষ্ট জুলুম , মূল সমস্যা পাশ কাঠিয়ে একের পর এক মৌলিক পরিবর্তন , সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকে প্রচলিত প্রথা অস্বীকার আগুনে ঘৃতাহুতির মত। দায়িত্বশীল পর্যায়ের সদস্যদের নীরবতা দুঃখজনক। সীমারেখার ভিতরে সম্ভাব্য উপায়ে সর্বোচ্চ সরব হওয়া যায় । বিতর্কিত প্রতিটি বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত । খলিফা ওমর (রাঃ) জুমার খুৎবা বন্ধ করে নিজের জুব্বার বিষয়ে উত্তাপিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন ।মোহরানার বিষয়ে সিদ্বান্ত দেয়ার পরেও একজন মহিলা সাহাবী (রাঃ)-র আপত্তিতে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। প্রশ্ন তোলা , জবাব দেয়া , প্রয়োজনে সিদ্বান্ত পরিবর্তন করা সবই আদর্শিক সংগঠনের গতিশীলতার সৌন্দর্য।

দুনিয়াবাসী কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহীদের জন্য আরো সঙ্কীর্ণতর। এমতাবস্থায় পুত -পবিত্র পরিবেশে দাওয়াতে – দ্বীনের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্টদের বড় কর্তব্য। সকলেরই দায়িত্বশীল ভূমিকায় এগিয়ে আসতে হবে। বিভেদ – হিংসা -বিদ্বেষ-ক্ষোভ নয়। ধৈর্য – উদারতা -ক্ষমা – ভালবাসা কাম্য । আল্লাহ বলেন ,” অবশ্য যে সবর করে ও ক্ষমা করে তার এ কাজ অবশ্যই বড় উঁচুমানের হিম্মতের মধ্যে গণ্য। (সূরা শূরা -৪২:৪৩)

গঠনতন্ত্র – পরামর্শসভা – সংখাগরিষ্টতা – বিধিবদ্ধ নিয়মে সিদ্ধান্ত হবে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত আদর্শিক সংগঠনে ঐতিহ্য , ইনসাফ , ভ্রাতৃত্ব ,আমানতদারী হচ্ছে প্রাণ স্বরূপ। প্রাণ ছাড়া দেহ যেমন মূল্যহীন তেমনি ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা ইসলামী সংগঠন চলৎশক্তিহীন। যে কোন ধরনের নেফাক হচ্ছে মরনব্যাধি। দর্শনের ভিন্নতা তৈরী হয়ে গেলে নিজ দায়িত্বে আগে থেকেই সংগঠন – প্রতিষ্টান সমূহ থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত। কিন্তু কুধারণা – সন্দেহ প্রবণতা ক্যানসার-সম। এমন ক্ষেত্রে বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে ছেড়ে দেয়া উচিত। ইফকের ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বার বার আসমানের দিকে তাকাতেন । তবে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেতৃত্বের অন্যতম যোগ্যতা বটে। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি দূরত্ব তৈরী করে ।

বৃহত্বর স্বার্থে সঙ্কট সমাধানে দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে হয়। অনেক ছাড় দিতে হয়। অনেকটা হুদায়বিয়ার সন্ধির মত। সাময়িক বিপর্যয় মনে হলেও যেখানে মহান মক্কা বিজয়ের সূচনা নিহিত ছিল। মহান আল্লাহর ঘোষণা , ” আমরা নিশ্চয় তোমাকে বিজয় দিয়েছি একটা উজ্জ্বল বিজয় ” – (সূরা আল – ফতেহ : আয়াত ১)। পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনায় সর্বোচ্চ উদারতা , প্রখর দূরদৃষ্টি ও সংগঠনের স্বার্থের অগ্রাধিকার প্রদানে প্রকৃত তাকওয়ার ভিত্তিতে যথার্থ সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয় ।

মনে রাখতে হবে সমাধানই সফলতা। উপযুক্ত কাজটা করে সময়ের নায়ক হওয়া। দোয়ার স্থায়ী উৎস নিশ্চিত করে ভাগ্যবান বনে যাওয়া। ভাবমূর্তি হারিয়ে – জনশক্তি খুইয়ে – খালেছ মনে ভাঙন ধরিয়ে অশ্রু ঝরিয়ে চলা এগিয়ে যাওয়া নয়। সকল দায় নিয়ে খলনায়ক হওয়া। ইতিহাসের অমোঘ বিধানে সুযোগ হারানো ভাগ্যাহত ছাড়া আর কিছুই নয়।

সর্বোপরি মহান আল্লাহ তায়ালার যে ঘোষণাটি সব সময় মনের ভিতর জাগরুক থাকা চাই ,” নিশ্চয়ই আমার কাছে আসতে হবে। এবং নিশ্চয়ই আমার কাছে হিসাব দিতে হবে ” সূরা আল-গাশিয়া ২৫-২৬ ” ।

sirajulislamshaheen@yahoo.com, 14/09/2021 , 09.30am ; London।

শেয়ার করুন