৪ মে ২০২৬, ৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কর্তৃক জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তিটি ছিল জনগণের বাক স্বাধীনতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।জনগণের কন্ঠরোধ ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বাকশালী নমুনা।বুঝে হোক বা না বুঝে হোক,আবেগ কিংবা উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে এটি জারি হয়েছিল তা স্পষ্ট। অবশেষে চব্বিশ ঘন্টার আগে ৪৮ঘন্টা সময় দিয়ে বেঁধে দেয়া আলটিমেটামযুক্ত গণবিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করা হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।
গণবিজ্ঞপ্তিটিতে জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার কথা বলা হয়েছে।কিন্তু সেটি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? সেখানে যে কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন দেয়ার কথা সেটি এখনো গঠিতই হয়নি।নিবন্ধন দিচ্ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পিআইডি(তথ্য অধিদপ্তর)।(সকল অনলাইন গণমাধ্যমকে কমিশনের কাছে নিবন্ধিত হতে হবে; তবে কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো সংযুক্ত সংস্থা নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করবে;)।
গণবিজ্ঞপ্তিতে কিছু অনলাইন নিউজপোর্টালের কথা বলা হয়েছে। যারা রেজিষ্ট্রেশন ব্যতীত ভূল,অসত্য, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত,মানহানিকর,সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা ভিত্তিক সংবাদ প্রচার করছে।এই কর্মকাণ্ডগুলো তো রেজিষ্ট্রেশন নিয়েও কোন গণমাধ্যম করতে পারবে না।দেশের প্রথম সারিরও কোনো কোনো মিডিয়া এই ধরনের অপসাংবাদিকতায় কখনো কখনো জড়িয়ে পড়ে।এগুলো অনৈতিক।Ethics of Journalism এর পরিপন্থী।যদি কেউ করে,নিবন্ধিত/অনিবন্ধিত বলতে কিছু নয় সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি দেশে প্রচলিত বিদ্যমান আইনে প্রতিকার চাইতে পারেন।এটা তার অধিকার। তাই বলে ঢালাওভাবে সকল গণমাধ্যমের উপর খড়গহস্ত হবেন,এটি তো সভ্য সমাজে সমীচীন নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে রেজিষ্ট্রেশন বিহীন নিউজপোর্টাল ডোমেইন থেকে অপসারণ,কঠোর আইনগত ব্যবস্থা ও এধরনের পোর্টালেের প্রকাশিত কোন সংবাদ সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ,শেয়ার,লাইক ও কমেন্ট থেকে জনগণকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।এবং বলা হয়েছে এটি জনস্বার্থে জারী করা হয়েছে। জনগণকে এমন নির্দেশনা দেওয়া প্রকারান্তারে মত প্রকাশের অধিকারের উপরই স্পষ্ট আঘাত। এটাও এক ধরনের সেন্সরসীপ।
মনে রাখা প্রয়োজন,গণমাধ্যম গণমানুষের কথা বলে।সাংবাদিকরা নিজের কথা লিখে না,মানুষের সুখ-দু:খ,আনন্দ -বেদনা,সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম,দূর্নীতি, অসঙ্গতি সহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে।সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে জনগণের কন্ঠরোধ করা।যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই, সেখানে গণতন্ত্র নেই। তবে,গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা অনেক বেশী।স্বাধীনতার নাম নিয়ে কারো চরিত্র হনন,অসত্য তথ্য পরিবেশন ইত্যাদি বিষয়গুলো সাংবাদিকতার স্বাধীন সত্ত্বা ও মূলধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।এটি গণমাধ্যমকে খেয়াল রাখতে হবে।অনেক সময় স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও সত্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা, পক্ষপাতহীনতা ও সংবাদমূল্যের ঘাটতি দেখা যায়।
জনগণকে ধারণা দিতে হবে, ভিউ শিল্পের কোন মানদণ্ড নয়।সংবাদ শিল্পের মানদণ্ড হলো সত্যতা(বিশ্বাসযোগ্যতা)। সংবাদের সত্যতা যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনুধাবন করতে হবে। ডিজরেলি বলেছেন,’সময় সংবাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কিন্তু সত্যতা তার চেয়েও দামী।’টমাস ব্রুকস সপ্তদশ শতাব্দীতে বলেছেন,’সত্যতা অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং সত্যতাই পরিণামে জয়ী হবে।’সত্যতাই হচ্ছে সাংবাদিকের চুড়ান্ত লক্ষ্য। পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠতা হচ্ছে আরেকটি অন্যতম লক্ষ্য। অসত্য ও অসংলগ্নতা ক্ষমার অযোগ্য। ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য গোপন করা সাংবাদিকতার স্পিরিটকে ব্যাহত করে।
গণমাধ্যম নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তিটি প্রকৃতপক্ষে গণবিরোধী। আইন,সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী।বাংলাদেশের সংবিধান ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। ফ্যাসিবাদী কায়দায় এধরনের অন্যায়,এখতিয়ার বহির্ভূত ও উদ্দেশ্যেমূলক আল্টিমেটাম মূলত স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রের অংশ।গুরুতর অপরাধের শামিল। বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীর পর্যবেক্ষণ করেছি।সর্বশ্রেণীর মানুষের পক্ষ থেকে পুলিশের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।মানুষ এখন সচেতন। গণমাধ্যমের উপর আঘাত আসলে জনগণ প্রতিবাদ করবেই।
অনলাইন গণমাধ্যমের ব্যাপ্তি,পরিধি,শক্তি ও ক্ষমতা অনেক বেশী। এটি বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত, সর্বাধুনিক, টেকসই ও সম্প্রসারণশীল মিডিয়া। আধুনিক সাংবাদিকতা।এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের(4IR) ফসল।নীতিমালায় এর সংজ্ঞা নিম্নরূপ : ‘অনলাইন গণ্যমাধ্যম’ বলতে বাংলাদেশের ভূখ- থেকে হোস্টিংকৃত বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্টারনেটভিত্তিক রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র বা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে সম্প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত স্থির ও চলমান চিত্র, ধ্বনি ও লেখা বা মাল্টিমিডিয়ার অন্য কোনো রূপে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ বা সম্প্রচারকারী বাংলাদেশি নাগরিক বা বাংলাদেশে নিবন্ধিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে।
গোলজার আহমদ হেলাল
সভাপতি
সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব
৩০/০৪/২০২৬,সিলেট