শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১ জুলাই ২০২২, ১০:২৭ অপরাহ্ণ

প্রসঙ্গ : বর্তমান জামায়াত : একটি পর্যালোচনা

আপডেট টাইম : জুলাই ১, ২০২২ ১০:২৭ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

।। এনামুল হক ।।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডাক্তার শফিকুর রহমানের একটি ফেসবুক স্ট‍্যাটাসকে নিয়ে দুই দিন থেকে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যমে রাজনীতির নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তিনি তাঁর ফেসবুক স্ট‍্যাটাসে পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য উপকারিতার কথা বলেছেন, সেতুতে টোল কমানোর জন্য দাবি জানিয়েছেন। আমার দৃষ্টিতে এটি নতুন শতাব্দীর পজেটিভ রাজনীতির বার্তা বহন করে।

তবে বাংলাদেশের চিরচারিত নিয়ম অনুযায়ী হয় তো কেউ কেউ আশা করেছিলেন জামায়াত আমীর পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন, দূর্নিতী নিয়ে কথা বলবেন, অপচয় ও বেশি ব‍্যয় নিয়ে বক্তব্য দিবেন কিন্তু তিনি দিয়েছেন ঠিক বিপরীত।

এই বক্তব্যের কারনে অনেকেই আওয়ামীলীগ ও জামায়াতের মাঝে গোপন সমঝোতার আশঙ্কা বা সন্দেহ দেখছেন।

এছাড়াও মিডিয়ার ভাষ‍্য অনুযায়ী জামায়াত তিন শ আসনে সংসদ নির্বাচনের প্রস্ততি নেওয়ার খবরে বিএনপির সাথে জোট ভাঙ্গার কথা জোরদার হচ্ছে।

সম্প্রতি শুনা যাচ্ছে জামায়াতের একজন নায়েবে আমীর এবং সাবেক সংসদ সদস্যের সাথে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর একান্তে বৈঠক হয়েছে। এটি যদি সঠিক হয়ে থাকে এখানে জামায়াতের কোন কিছুই গোপন করার প্রয়োজন নেই। কারন জামায়াত তার স্বত্ব কারো কাছে বিক্রি করেনি।

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও মুক্তির জন্য একাধিক বার বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনমন্ত্রীর দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। কথায় বলে সারা দেশের মানুষ বিএনপি করে আর বিএনপির নেতারা আওয়ামীলীগ করে।

তাহলে বিএনপির নেতারা নিজেদের স্বার্থে মন্ত্রীদের দরজায় দরজায় ঘুরলে যদি অপরাধ হয় না জামায়াতের কোন নেতার সাথে মন্ত্রীর বৈঠক প্রকাশ করলে সমস্যা থাকার কথা নয়।

ডাক্তার শফিকুর রহমান আমীর নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াতের একজন প্রভাবশালী নেতা আমার সাথে একান্তে আলাপকালে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এই মুহুর্তে জামায়াতের কি করা উচিত বলে মনে কর?

আমি সরাসরি বলেছিলাম এই মুহুর্তে জামায়াতকে রাজপথ থেকে সরাতে হবে। এরপর সংগঠন ও জনশক্তিকে রক্ষা করতে হবে। আঙ্গুল নাচানো বক্তব্য বন্ধ করতে হবে। জনশক্তিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে হবে। গণমুখী নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে। তিনি নিরবে কথা গুলো শুনছিলেন। এরপর আমার হাত মুষ্টি ধরে বললেন, তোমার চিন্তা গুলো গভীরে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেস এফ মরিয়ার্টির বাসায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডক্টর গওহর রিজভীর সাথে জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতার বৈঠক হয়। তখন শুধুমাত্র জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল।

সেই বৈঠকের পর জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী, কামারুজ্জামান ও ব‍্যারিষ্টার রাজ্জাককে ভুল বুঝেন জামায়াতের তৎকালীন দায়িত্বশীলরা। এরই মাঝে সংগঠন ও জনশক্তিকে রক্ষা করতে দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কারাগার থেকে একটি চিঠি লিখেন কামারুজ্জামান। প্রয়োজনে মৌলিকত্ব অক্ষুন্ন রেখে বিকল্প প্লাটফর্ম তৈরির কথা বলেন তিনি।

কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তেমন কিছুই হয় নি। সোনার মানুষ গুলোকে হারাতে হয়েছে, শত শত মায়ের বুক খালি হয়েছে, আন্তর্জাতিক লবি আর দেশের আদালতের বারান্দায় কোটি কোটি টাকা ব‍্যয় হয়েছে, হামলা মামলা জেল জুলুম হরতাল অবরোধে সাধারণ জনশক্তির জীবন বিপন্ন হয়েছে। রিক্স ফান্ড জরুরি ফান্ড এই কালেকশন সেই কালেকশনে গরীব মধ‍্যবিত্ত দিনমজুর জনশক্তি দিশেহারা হয়েছে। হাজার হাজার তরুণ মেধা সম্পদ পাচার হয়েছে। কত মানুষ আহত আর পঙ্গু হয়ে জীবন অকেজো করেছে তার কোন হিসাব নেই।

পদ্মা মেঘনা যমুনা সুরমা কুশিয়ারার পানি গড়িয়েছে বহুদূর। অবশেষে যা হওয়ার দরকার ছিল ২০১৪ সালে, তাই যদি হয় ২০২৩ সালে তাতেও আমি কোন সমস্যা দেখছিনা। দেরিতে হলেও নিজেদের নিজেরা চেনা প্রয়োজন।

জামায়াত তার প্রথম ও দ্বিতীয় সারীর সকল নেতাদের হারিয়েছে অনেকেই এখনো কারাবন্দি। বতর্মানে তৃতীয় ও চতুর্থ সারীর নেতারা দলটির হাল ধরেছেন। বতর্মান দায়িত্বশীলদের ধন্যবাদ দিতে হয় শত প্রতিকুল আর ধ্বংসস্তপে দাড়িয়েও তারা দলটিকে ধরে রেখেছেন।

তবে জামায়াতের নতুন আমীর ধর্মভিত্তিক ও কনজারভেটিভ এই দলটিকে নতুন পথ দেখাচ্ছেন। আগে বরাবরই অভিযোগ ছিল জামায়াত নেতারা হলরুমের ভেতরে দুনিয়ার সুন্দর সুন্দর বক্তব্য উপস্থাপন করেন কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে নূন্যতম সম্পর্ক রাখেননা। জামায়াত নেতাদের পাঞ্জাবীর ইস্ত্রীর ভাজ ভাঙ্গেনা।

সেই কর্পোরেট পলিটিক্স সিস্টেম ভাঙ্গার চেষ্টা করছেন বতর্মান আমীর। বতর্মান আমীর এখন যে কাজ করছেন এই গনমুখী চরিত্র যদি আগেও থাকতো তাহলে জামানত বাজেয়াপ্ত হতোনা।

তবে অবশ্যই যে গনমুখী কার্যক্রম তিনি শুরু করেছেন তা নতুন শতাব্দীর রাজনীতির জন্য নতুন বার্তা দিচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের জামায়াত নেতাদের এখন উচিত এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।

জামায়াতের উচিত সম্ভাবনাময় গনমুখী তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসা।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সেক্রেটারি জেনারেলদের আঙ্গুরের জোটার মতো ঢাকায় জুটি বেধে না রেখে যার যার এলাকায় সাধারণ জনতার মাঝে পাঠিয়ে সেটআপ করা প্রয়োজন।

জামায়াতের মাঠ পর্যায়ের এবং অনলাইনে জনশক্তিকে আরও সহনশীল ধৈর্যশীল হওয়া উচিত। একটি আদর্শিক সংগঠনের জনশক্তিকে চলন বলন কৌশল স্ট‍্যাটাস কমেন্ট বক্তব্য বিবৃতিতে আদর্শিকতার পরিচয় দেওয়া উচিত।

পাশাপাশি ছাত্রশিবিরকে ক্ষমতা গ্রহণ আর ক্ষমতা থেকে নামানোর এই রাজনীতি থেকে দূরে রেখে শিবিরকে দেশ পরিচালনার জন্য একদল যোগ্যতা সম্পন্ন দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির সুযোগ দিতে হবে।

গনরাজনীতির কোন বিকল্প নেই। নতুন শতাব্দীর বিপ্লবের একমাত্র পথ গনরাজনীতি। কিন্তু জামায়াত গনরাজনীতিতে অংশ গ্রহন করতে গিয়ে সেখানেও কনজারভেটিভ সিষ্টেম ধরে রেখেছে যা গনরাজনীতির জন্য সাংঘর্ষিক।

যেমন একটি সংসদীয় আসনে জামায়াত তার দল মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সিলেক্ট করেছে রুকনদের ভোটে। সেই আসনে নাগরিক আছেন প্রায় সাত লাখ ভোটার আছেন প্রায় চার লাখের উপরে। সেখানে রুকন আছেন সর্বোচ্চ দুই শ। এই দুই শ রুকনদের মধ‍্যে দেড় শো জনেরই সমাজের উপর বা ভোটের রাজনীতিতে কোন প্রভাব নেই।
কিন্ত এই সংসদীয় আসনে অনেক মানুষ আছেন জামায়াতের রুকন বা পদবিধারী নেতা নন কিন্তু তারা জামায়াতের সূধী শুভাকাঙ্খী এবং কোন না কোন ভাবে সমাজের প্রতিণিধিত্বশীল মানুষ যারা সমাজ ও ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব রাখেন তাদের কোন মতামতকেই জামায়াত গ্রহণ করেনা। এটি গনরাজনীতির বিপরীত চরিত্র। জামায়াতের এই অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারলে গনরাজনীতিতে জনপ্রতিণিধিত্বশীল রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান আরও ভাল হতে পারে।

সম্প্রতি জামায়াত আমীর দোয়ারা বাজারের একটি বক্তব্যে সরকার গঠনের আশাবাদ ব‍্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা এমন একটি সরকার চাই যারা আল্লাহর ভয় নিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে এবং গভীর রাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয়ে কাঁদবে।

জামায়াত সরকার গঠন করবে এমন হাস‍্যকর কথা হয় তো বাংলাদেশের মানুষ কখনও বিশ্বাস করবেনা। কিন্তু জামায়াত মানুষের ভালবাসা অর্জন, কিংবা জনগণের প্রতিণিধিত্ব করতেই পারে।

মানুষের অধিকার আদায়ে দল ও মত কোন বাধা নয়। নতুন শতাব্দীর রাজনীতিতে জামায়াতের স্বতন্ত্র পথচলা সফল হোক। শুরু হোক সেবার রাজনীতির এই অগ্রযাত্রা।

ফাঁসি, গুম,খুন হত‍্যা জেল জুলুম মামলার পাহাড় আর রক্তে ভেজা পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে জাতির মুয়াজ্জিন দাড়িয়ে বলুন,
” হে জাতী আমরা শেষ হয়ে যাইনি, আমরা হারিয়ে যাইনি, আমরা শান্তির বাণী নিয়ে এসেছি, আমরা কালেমার বাণী নিয়ে এসেছি, হে জাতী আমরা মজলুম, আমরা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম নির্যাতনের শিকার”।

কবির ভাষায়-
আমার এই ঘর ভাঙ্গিল যে
আমি বাধিব তার ঘর,
আপন করিয়া খুজিয়া বেড়াই
যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করেছে পথের ভিখারি
আমি পথে পথে ফিরি তার লাগি।

লেখক:সাংবাদিক,বার্মিংহাম, যুক্তরাজ‍্য।

শেয়ার করুন