শনিবার, ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৫ আগস্ট ২০২৩, ১:৩৫ অপরাহ্ণ

পিরোজপুরের পথে-

আপডেট টাইম : আগস্ট ১৫, ২০২৩ ১:৩৫ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

শাহাদাত উল্লাহ টুটুল

শৈশবে আমরা ছোট দুই ভাই মাহফিলে যেতাম আব্বার হাত ধরে। আব্বার কোলে বসে ওয়াজ শুনতাম। কনকনে শীতের রাতে আব্বা আমাদের গায়ে জড়িয়ে দিতেন তাঁর গায়ে থাকা কাশ্মীরী শালটি। এমনি এক শীতের রাতে পোস্তগোলা বালুর মাঠে শুনেছিলাম আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ। সময়টা ছিল ১৯৮৬ সালে ডিসেম্বর।

ক্লাস নাইনে যখন পড়ি বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে গিয়েছিলাম পান্থপথে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে। তাফসীর শুরু হতে না হতেই মুহূর্মুহু বোমার শব্দের প্রকম্পিত হল গোটা মাহফিল স্থল। আমরা স্বেচ্ছাসেবক হয়ে মাহফিল বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন সময়ে মাওলানার কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বেশী ঘনিষ্ঠ হয়েছি জোট সরকারের শেষ বছর। ২০০৬ সালে নির্বাচনে মাওলানার নির্বাচনী আসনের নির্বাচন তদারকির দায়িত্ব ছিল আমার উপর। মাওলানার নিজ থানা ইন্দুরকানীসহ নেছরাবাদ ও সদর থানা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সাথে অনেকবার মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল।

এসময়গুলোতে মাওলানার সাথে অনেক স্মৃতি…। আজকের এই সময়ে একটি সফরের কতা বিশেষ মনে পড়ছে। শহীদবাগের বাসা থেকে মাওলানার গাড়ীতে রাওনা হয়েছি। ঢাকা থেকে মাওয়া ঘাট পেরিয়ে আমরা যাচ্ছি ভাঙ্গার পথে। গাড়িতে থাকা সাগর কলা আমাদের সবাইকে খেতে দেয়া হল। খাওয়া শেষে কলার খোসা জানালা দিয়ে ফেলে দিবো না গাড়ীতেই রাখবো ভাবছি। এমন সময় অন্য একজন জানালা খুলে কলার খোসা বাইরে ফেলে দিতে চাইলে মাওলানা ইশারা করে রেখে দিতে বললেন।

আমি ভাবছি রাস্তায় না ফেলে একটু দুরে ফেলে দিলেতো কোন সমস্যা হওয়ার কথা না… নিষেধ করলেন কেন? একটু পরেই দেখলাম রাস্তা পাশে অনেকগুলো ছাগল ঘাষ খাচ্ছে। মাওলানা ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন, আর সহকারীকে বললেন কলার খোসাগুলো ছাগলগুলোর কাছে দিয়ে আসতে। আর আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘শোনো টুটুল! যার হক তার কাছে পৌঁছে দেয়াই হল মুমিনের কাজ’।

গাড়ি এবার চলছে পিরোজপুরের পথে। আমি আর মাসুদ সাঈদী ভাই বসেছি পাশাপাশি। মাওলানা সামনের বাঁ পাশের সীটে ড্রাইভারের পাশে। নানান বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। বললেন তাঁর নির্বাচনী আসনে দুস্থ মহিলাদের বিতরণের জন্য সরকারের কোন একটা সংস্থা থেকে ১৫টি সেলাই মেশিন বরাদ্দ পেয়েছেন। কিন্তু প্রতি ইউনিয়নে বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং সংখ্যালঘুদের দিতে গেলে কমপক্ষে ২৫ টি সেলাই মেশিন দরকার। এখন আমি কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেই? আমাকে এখন নিজের পকেট থেকে আরো ১০টি সেলাইমেশিন কিনে দিতে হবে। আমি হেসে বললাম নির্বাচনী ফান্ড থেকে কিনে দেয়া যায় না। মাওলানা বললেন, নির্বাচনী ফান্ড যা পাই তাতো পিরোজপুর আসা যাওয়ার তেল খরচই শেষ হয়ে যায়।

আমাদের সফরসঙ্গী একজন মুখফসকে বলে ফেললেন মালাউনদের না দিলে হয় না? বলতে না বলতেই মাওলানা ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন এবং তাকে গাড়ি থেকে নেমে যেতে বললেন। আমি উনাকে এর আগে এমন রাগতে কখনো দেখি নাই। রাগে তিনি রীতিমত কাঁপছিলেন। বললেন ‘কে অভিশপ্ত আর কে রহমতপ্রাপ্ত সেটা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। কোন মুমিন কখনো এমন শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনা’।

এর কয়েক বছর পর কাশিমপুর কারাগারে আবার দেখা হয়েছিল। মাসুদ সাঈদী ভাই আমার নামটা মনে করিয়ে দিতে চাইলে হাসি দিয়ে বললেন ‘টুটুলতো ঢাকার জমিদার ওকে চিনবোনা’? সাধারণত চট্টগ্রামে জমির মালিককে জমিদার বলা হয়। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে পিরোজপুর যেতে দোলাইরপাড় পার হতে আমাদের সামান্য পৈত্রিক বাড়ীটা দেখিয়েছিলাম। তখনই বলেছিলেন ‘তুমিতো দেখি ঢাকার জমিদার’। বাসায় যেতে অনুরোধ করলে বলেছিলেন ‘তোমার বিয়েতে দাওয়াত দিও আসবো ইনশাআল্লাহ। আমিও সুযোগ পেয়ে বলেছিলাম দাওয়াতে আসলে বিয়ে পড়ানো দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। তিনিও স্বাভাবসূলভ হেসে সম্মতি জানিয়েছিলেন।

না তিনি আসতে পারেননি। তার আগেই তিনি গ্রেফতার হন। কাশিমপুরে সাক্ষাৎ শেষে বিদায় বেলায় মন খারাপ দেখে অভয় দিয়ে বললেন, ‘চিন্তা করোনা আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। দোয়া করো কোরআনের মাহফিলে একবারের জন্য হলেও যেন যেতে পারি’।

জ্বী মাওলানা, সত্যি আবার দেখা হয়েছেন আপনার সাথে… আপনার হাসিমাখা মুখখানা যখন মূহুর্তেই ভাইরাল হল। তখন আমি দেখছিলাম আপনি হাসছেন কোরআনের মাহফিলে, সাংস্কৃতিক আয়োজনে, শহীদবাগের বাসায়, আলফালায়, পিরোজপুরে, মাওয়ার ফেরীতে, দীর্ঘ সফরে, ২৮ অক্টোবরে, পল্টনে… শত কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়…

লেখক :মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

শেয়ার করুন