৫ জুলাই ২০২২, ৪:২৮ অপরাহ্ণ
“খারাপ কাজ করলে আমার মেরুদণ্ড ভেংগে দিবেন।”-ডাঃ শফিক
এ যেন আমিরুল মুমিনীন কিংবা খলিফাতুল মুসলিমীনদের কালজয়ী দুঃসাহসী উক্তির দ্বিধাহীন পুনরাবৃত্তি।
মাহির সারোয়ার (আল মাহি)
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় প্রলংয়কারী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বানভাসী মানুষদের ব্যাপক সহায়তা করছে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো।দীর্ঘ এক যুগেরও অধিক সময় থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা প্রভাবশালী ইসলামী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো স্মরণকালের সর্বনাশা ভয়াবহ বন্যায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে অকৃত্রিমভাবে।ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যে ভয়াবহ এ দুর্যোগে শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত তারা পানিবন্দী অসহায় মানুষের পাশে আছে। প্রায় সর্বত্রই নানা দমন-পীড়নের শিকার এ দলের নেতা কর্মীরা সর্বাগ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা থেকে ছুটে এসেছেন বন্যার্ত মানুষের খোঁজ নিতে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই প্রথম সিলেটে এসেছেন। তিনি পানি ঠেলে বানভাসীদের সম্মুখে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বলেছেন, আমি ত্রাণ দিতে আসেনি। এসেছি ভাইদের বোনদের খোঁজ নিতে। সাথে যা আছে তা উপহার। সিলেট নগরীতে পদার্পণ করেই বন্যা পীড়িত জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন,
“জানইন আফনারা আমরা মজলুম সংগঠন। আমরারে ঘরও বইতে দেয় না,বাইরে হাঁটতে দেয় না,আফনারার লগে মিশতে দেয়না,মানষর সুখ-দুঃখ বুঝার সুযোগ দেয় না, মারে-ধরে ফাঁসিত ঝুলায়,খুন খরে,গুম করে,গ্রেফতার করে।”
“কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ,ইতা করিয়া ও আমরারে থামানি উমানি যাইতো নায়।ইনো কোনো ফুলিশ উলিশ মানতাম নায়”
“আমরা কাজ করি আল্লাহর লাগি,আমরা ভালোবাসা চাই আল্লাহ তায়ালার আর মানষর”
সিলেটী ভাষায় তাঁর এই কথাগুলো একদিকে যেমন সাহসী ও উদ্দীপনামুলক,অন্যদিকে মানবিক ও আবেদনময়ী।তাঁর বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে দলের নেতা কর্মীরা দিন রাত বন্যার্ত মানুষের পাশে কাজ করে যাচ্ছেন। গোটা জনপদে দলের নেতাকর্মীরা প্রাণচাঞ্চল্য হয়ে অবিরত কাজ করছেন।
ডাঃ শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর। একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সুবক্তা, দক্ষ সংগঠক এবং তৃনমুল থেকে বেড়ে উঠা একজন ধীমান ও চৌকষ নেতা হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি আছে তাঁর।
তিনি ২০২০-২০২২ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমীর নির্বাচিত হন। তিনি জামায়াতের চতুর্থ নির্বাচিত আমীর। তৃতীয় সারির তৃতীয় প্রজন্মের এক জন নেতা হিসেবে এমন এক সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এ (জামায়াত) সংগঠনের মূল নেতৃত্বের হাল ধরেছেন যখন তাঁর দল স্মরনাতীতকালের ভয়াবহ সংকট অতিক্রম করছে। দেশী, বিদেশী ও আভ্যন্তরীন নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং শাসকদলের অত্যাচার নিপীড়নে বিপর্যস্ত এ সময়ে দলের যোগ্য কান্ডারী হলেন ডাঃ শফিকুর রহমান।
তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে এক গর্বিত সন্তান।সম্ভবতঃ তিনিই জামায়াতের প্রথম আমীর যার সাথে মুক্তিযুদ্ধকালে সারাদেশে সংগঠিত মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের কোনোও আচঁড় নেই। শফিকুর রহমান একজন উজ্জ্বল রাজনৈতিক নক্ষত্র।
স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর রয়েছে বিরাট ভূমিকা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ নেতা পেশায় চিকিৎসক হলেও পরবতীর্তে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিগণিত হন। তিনি দলীয় দায়িত্ব কাঁধে নিতে ১৯৮৬ সালে দলীয় সিন্ধান্তেই সরকারী চাকুরী ত্যাগ করেন। এটা একটি বিরল ঘটনা।
ডাঃ শফিক ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক পুরনো, অনেক দিনের। আমি সাধারণত রাজনৈতিক কোনো ষ্ট্যাটাস দেই না,লিখিও না। আজকের এই লিখাটিও রাজনৈতিক নয়, স্মৃতিচারনমূলক মাত্র। কলেজ জীবনে (১৯৯৫-১৯৯৬) আমি জনপ্রিয় শিশু- কিশোর পত্রিকা (সারা দেশের মাঝে সর্বাধিক প্রচারিত) মাসিক নতুন কিশোর কন্ঠের পাঠক ও সংগঠক ছিলাম। সেই সুবাদে ডাঃ শফিক ভাইয়ের শাহ্জালাল উপশহর এ ব্লকের বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করতাম। শফিক ভাইয়ের ভাতিজা মেধাবী স্কুল ছাত্র মাহফুজুর রহমান বেলাল, শফিক ভাইয়ের দুই মেয়ে প্রতিভাবান স্কুল ছাত্রী সালওয়া ও সাবরীন কিশোরকন্ঠের পাঠক ছিল। ডাঃ শফিক ভাইয়ের একমাত্র ছেলে (নামটা ভুলে গেছি) সেই সময় খুবই ছোট ছিল। আমার মনে পড়ে একবার স্কুলে গিয়েছিলাম কিশোরকন্ঠ বিলি করতে। সেই সময় ঐ খানে দেখা হলো ডাঃ শফিক ভাইয়ের সাথে। তিনি তাঁর ছেলেকে আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু, হাসপাতালে তার একটি জরুরী কাজ থাকায় আমাকে তাঁর ছোট্ট ছেলেকে বাসায় পৌঁছে দিতে সহযোগিতা চাইলেন। এভাবে তাদের হাতে কিশোরকন্ঠ তুলে দিতাম আমরা।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় প্রায় ৬ মাসেরও অধিক কাল কুলাউড়ায় ছিলাম। ডা: শফিকুর রহমান সেখানে চারদলীয় জোট থেকে ইলেকশন করছিলেন। সে সময় তাঁর সাথে অনেক বার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার সেই ইউনিয়নের জলে-স্থলে আমাদের বিচরণ আর শফিক ভাইয়ের আকষর্ণীয় সম্মোহনী বক্তব্য সবাইকে বিমোহিত করে তুলত। অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা, অনেক গল্প, হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলি হৃদয়ে বার বার নাড়া ও দোলা দিয়ে যায়। কুলাউড়ার মানুষজন শফিক ভাই পরিচালিত মা-মনি হাসপাতালে আসলেই আমাকে খোঁজ করত। শফিক ভাই তাঁর চিরাচরিত কন্ঠে ল্যান্ড ফোনে কল করে বলতেন, “—। তোমার মানুষ আইছইন। তাড়াতাড়ি আসো”।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো শফিক ভাই আমাকে তাঁর মায়াবী কন্ঠে কখনও —বলে ডাকেন, আবার কখনও —বলেও ডাকেন। অথচ—নামটি আমার গ্রামের মানুষ ছাড়া আর কেউই ডাকে না। অথচ আজ থেকে ২৭ বছর আগে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরে প্রবেশ করেছিলাম তখন — নামটি পেছনে পড়ে গিয়েছিলো। মাঝে-মধ্যে পুরো নামের সাথে কেউ ডাকলেও আলাদা করে এই ডাকে নাম উচ্চারণ করার লোক আমার শহুরে জীবনে বিরল। মধুর ও স্নেহময়ী কন্ঠে অনুজদের ডেকে কথা বলা লোক এ সমাজে আর নেই। সেই শ্রদ্ধাস্পদ অগ্রজ আর খোঁজে পাওয়া যায় না এখন। সামগ্রিক ভাবে আমরা হয়েছি ইট-পাথরের দালানের মতো শক্ত, হারিয়েছি জলমিশ্রিত সিমেন্টের সেই নরম গাথুঁনি।
ডা: শফিকুর রহমান একজন জাতীয় নেতা।দলের আমীর নির্বাচিত হয়ে সিলেটে প্রথম আসেন ২১শে নভেম্বর’১৯ বৃহস্পতিবার। সে সময় তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল এবং একসাথে সান্ধ্যকালীন নাস্তাও করেছি। তাঁর মুখ থেকে রাজনীতি, কুটনীতি, দেশ, ধর্ম, দেশে দেশে মুসলিম নিপীড়ন ও বর্হিঃবিশ্বে ইসলামের পূর্ণজাগরণ সহ অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতি আশা জাগানিয়া কথা শুনেছি। জানা-অজানার এক ফাঁকে আমিও প্রশ্ন করেছিলাম, আরো অনেকেই অনেক কিছু জানতে চেয়েছিলেন।
ডাঃ শফিকুর রহমান তাঁর স্বভাব সূলভ ভঙ্গিতে বললেন -র প্রশ্ন গুলো পুরোপুরি কুটনৈতিক। তিনি আরববিশ্ব সহ বিশ্বরাজনীতি ও তাঁর দলের অবস্থান সম্পর্কে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। আমি সেদিকে এগুতে চাই না। এক পর্যায়ে ডাঃ শফিক ভাই আবেগঘন বক্তব্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কথা ব্যক্ত করলেন যেগুলো তাঁর দল ও দলীয় নেতা কর্মীদের জন্য বর্তমানকালে অত্যান্ত সময়োপযোগী, কারণ জামায়াত ও জামায়াতের কর্মীরা এখানেই দোদুল্যমান, এতে তারা হোঁচট খান বার বার। তাই তাঁর মহামূলবান অভিব্যক্তির চুম্বক অংশগুলো পাঠকের কাছে তাঁরই ভাষায় তুলে ধরলামঃ
সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাশ করে মেডিকেল অফিসার হিসেবে সুনামগঞ্জের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে (জামালগঞ্জ কিংবা দিরাই বললেন) সরকারী চাকুরী করছি। সিলেট জেলা আমীর আমাকে চিঠি পাঠালেন মজলিশে শুরার বৈঠকে আসতে। আমি যথারীতি মজলিশে শুরার অধিবেশনে যোগ দিতে সুনামগঞ্জের সেই অজপাড়া গাঁয় থেকে রওয়ানা দেই। দিনটি ছিল ২৬শে মার্চ ১৯৮৬ ইংরেজী। রাস্তার দুরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতমানের ছিল না বিধায় সিলেট পৌঁছাতে আমার দেরী হলো। এসে পেলাম মিটিং সবেমাত্র শেষ হয়েছে। সভার সদস্যগণ তখনও স্থান ত্যাগ করেন নি। তৎকালীন জেলা আমীর সবাইকে বললেন মিটিং যদিও শেষ তারপরও আমরা একটু বসি। শুরু হলো আবার মিটিং। আমাকে বলা হলো আপনাকে আমরা সিলেটে চাই। বললাম, কিভাবে চান? চাকুরী সহ না চাকুরী ছাড়া। জেলা আমীর বললেন, সেটা আপনার ইচ্ছা। আমি কিছু সময় ভাবলাম, বললাম ১০মিনিট সময় দেন আমাকে। আমি ভাবলাম চাকুরীযুক্ত থেকে এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। তাই কিছুক্ষন পর একটি রেজিগনেশন (পদত্যাগ পত্র) লেটার জেলা আমীরের হাতে তুলে দিলাম। বললাম, এটা ডিজি হেলথ্ কে দিতে হবে। তৎক্ষনাৎ জেলা আমীরের মোটর সাইকেলে (সম্ভবত ৫০/৮০ মডেল) চড়ে তিনি সহ সরকারী দপ্তরে সেটি দিয়ে আসলাম। এই যে দলের ডাকে সংগঠনের শুরার বৈঠকে আসলাম, আর কখনও ফিরে যাই নি সুনামগঞ্জের আমার প্রিয় সেই কর্মস্থলে। ফিরেও তাকাই নি সেদিকে। আমার কাপড়-চোপড়, ব্যাগ এন্ড বেগেজ সব কিছুই পড়ে থাকল সেখানে। আড়াই বছর পর আমার ছোট ভাই ফখরুল সহ আমার এক চাচা সেগুলো সুনামগঞ্জ থেকে নিয়ে আসেন।
জেলা আমীর ঐ দিন তাঁর বাসার একটি কক্ষে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন এইখানে তুমি ও মিনু (আমার ওয়াইফ) থাকবা। আমি বললাম এটা কার রুম। আমাকে বলুন। তিনি বললেন, সেটা বলা যাবে না। তোমরা এখানে থাকবে। আমি বললাম, এটা যার বিছানা তিনিই এখানে থাকুন। আমরা বরঞ্চ অন্য কোথাও থাকি। এটা বরং বেটার হবে। তিনি ধমক দিয়ে বললেন, আমি জেলা আমীর না তুমি জেলা আমীর। এই ছিল অধস্থনদের প্রতি একজন জেলা আমীরের মায়া-মহব্বত ও ভালোবাসা। সেদিন জেলা আমীর তাঁর নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। বন্ধুগন, আমাদেরকে এই জায়গায় ফিরে আসতে হবে। নতুবা আমরা বারাকাহ পাব না। যদি আমরা পুনরায় এখানে (ভ্রাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসা, ত্যাগ স্বীকার) ফিরে আসতে পারি তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে বিজয়ী হব। কোনো শক্তি আমাদেরকে আটকাতে পারবে না।
স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ১৯৮৭ সালে সিলেটের উত্তপ্ত রাজনৈতিক ময়দানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য জেলা প্রশাসন সমঝোতা বৈঠকের আহবান করে। জেলা প্রশাসকের অফিসে আহুত মিটিংয়ে যোগ দিতে জিন্দাবাজারে আহত হন তৎসময়ের জেলা আমীর প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ অধ্যাপক ফজলুর রহমান। সন্ত্রাসীদের গুলি যখন লক্ষ্যচুত হলো তখন তারা রিভলবারের বাট দিয়ে তাঁর মাথা ভেঙ্গে দিল। আমি তাঁকে হাসপাতালে পাঠিয়ে খুবই হন্তদন্ত হয়ে ডিসি অফিসে গেলাম। তৎকালীন ডিসি-এসপি আমার দিকে লক্ষ্য করে বললেন কি, কেউ নিহত হয়েছে? আমি বললাম এই অবস্থা। তৎক্ষনাৎ সভা স্থগিত করে তাঁরা (ডিসি-এসপি) হাসপাতালে আমার নেতাকে দেখতে এলেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সে দিন বলেছিলেন, আমাদের আহবানে সাড়া দিয়ে সভায় যোগ দিতে এ ধরণের ঘটনা, মেনে নেয়া যায় না। একই দিনে প্রতিপক্ষ ৭২ জন কে গ্রেফতার করল প্রশাসন।
পরিস্থিতি ক্রমে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে গেল। সিলেট শহরে থাকার জায়গা ছিলো না। পায়ের নিচে মাটি নেই, এমন অবস্থা। আমরা হাউজিং স্ট্যাট আফতাব চৌধুরীর বাসায় জায়গা নিলাম। সেখানে ৩ দিন থাকার পর একদিন রাত্রে তাঁর স্ত্রী ভিতর থেকে চিরকুট পাঠিয়ে সংবাদ দিলেন- “আমার স্বামী জরুরী কাজে ঢাকায় চলে গেছেন। আমি হার্টের রোগী, দয়া করে ঘরটি ছেড়ে দিলে ভালো হয়।” আমরা নিরূপায় হয়ে কীনব্রীজ পার হয়ে নদীর ও পাড়ে চলে গেলাম। সেদিন সুরমা নদীতে আমাদের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু বিসর্জিত হয়েছিল। ফলে সিলেট শহরে অনেক ভাইকে গ্রামের বাড়ী-টাড়ী বিক্রি করে জায়গা জমি কিনতে উৎসাহিত করলাম।
মতের পার্থক্যের দরুন সহযোগী, বন্ধু অথবা প্রতিপক্ষ কাউকে আমরা ফুলের পাঁপড়ি দিয়েও একটি আঘাত করব না। আমরা সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। আমাদের কিছু ফেসবুক বোদ্ধা এমন বিশ্রী ভাষায় তাদের গালি-গালাজ করেন যা আমাদের দলের কোন পরিভাষো তো নয়ই এবং ইসলামেও এটি এলাও করে না। কেউ কোনো কষ্ট পায় এমন কিছু করা আমাদের জন্য শোভনীয় নয়। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের এক্ষেত্রে আরো দায়িত্ববান হতে হবে।আমাদের ব্যাক্তিগত আচার-আচরণ, লেনদেন ও পারিবারিক দায়িত্বপালনে আরো যত্নশীল হতে হবে। এতে উদাসীন হলে চলবে না।
মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই মানুষ। ধর্ম ও দল-মতের পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে মানবিকতার দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় মানসিকতা পরিহার করে চলতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের বড় পরিচয় আমরা মানবজাতি। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই আমাদের সৃষ্টি। এখানে কোন ভেদাভেদ নাই, দলীয় পরিচয় নেই। আল-কোরআনে আছে, মানুষও মানবজাতিকে উদ্দ্যেশ্য করেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বন্ধুগন, আমি আপনাদের এক ভাই। আমার দুর্বলতা সম্পর্কে আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কেউ ভালো করে জানবে না। ইলমী এবং আমলী যোগ্যতায় আমি একজন ফকিরমাত্র। আমাকে আপনারা ভালবাসেন বলেই এই গুরু দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করেছেন। এখানে আমার কোন ইচ্ছা বা অভিলাষ নাই। এ দায়িত্ব অভিনন্দিত কিংবা অভিষিক্ত হওয়ার নয়। অথবা মোবারকবাদ পাওয়ার মতো নয়। আমার দুইটা অনুরোধ। এ দায়িত্বের অবহেলায় অতীতে অনেকের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। আমি চাই না আমার দ্বারা শহীদের রক্তভেজা এ সংগঠন কালিমালিপ্ত হোক। আমি যদি কোনো খারাপ কাজ করি তাহলে আপনারা আমার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিবেন। এটা করলে আমার জন্য ইনসাফ হবে। আর যদি এটা আপনারা না করেন তাহলে আপনারা আমার হক (অধিকার) নষ্ঠ করলেন। আর আপনারা আমার জন্য দোয়া ও সহযোগিতা করবেন।
ডাঃ শফিকুর রহমানের শেষোক্ত বক্তব্যটি আমিরুল মোমেনিন কিংবা খলিফাতুল মুসলিমীনদের দায়িত্বভার গ্রহন পরবর্তীকালে উম্মুক্ত জনসমাবেশে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি যেন পূর্বসুরী সত্যানুসারী নেতৃত্বের কালজয়ী সেই দুঃসাহসী কথাগুলো দ্বিধাহীন চিত্তে পূণর্ব্যক্ত করলেন।
ডাঃ শফিক ভাই জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক প্লাটফরমের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সময় ও সুযোগমত সুবিধাজনক সময়ে এটার আত্মপ্রকাশ ঘটবে। অনেক কাজ এগিয়েছে। স্ট্রাটেজিক্যাল প্লান ইতোমধ্যে অনেকাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি চূড়ান্ত ফায়সালা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবেই। আমি কিংবা আপনাকে শুধু চেষ্টাটা করে যেতে হবে। আমরা সিরাতুল মুশতাকিমের পথে থাকবোই। আর কুরআন-সুন্নাহর পথই হচ্ছে এ পথ। তিনি হযরত ইয়াকুব (আ:) এর ইতিহাস টেনে বলেন, তিনি তাঁর পুত্রদেরকে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশের কথা বলেছিলেন। কিন্তু, কোন কাজ হয় নি। তবে আমরা কারো চাপে কিছু করবো না, আবার আমরা কোন কিছু উপেক্ষা ও করব না।
ডাঃ শফিক ভাই কথা প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের দেশে কার্যত কোন রাজনীতি এখন আর নেই।রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়েছে। দেশে এক ব্যক্তির শাসন চলছে। খোদ আওয়ামীলীগ ও যেখানে ঠিকমত রাজনীতি করতে পারতেছে না, সেখানে বি.এন.পি সহ বাকী রাজনৈতিক দলগুলোর কথা আর কি বলব?
তিনি বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে তুরস্ক কে মুসলিম বিশ্বের ত্রাণকর্তা উল্লেখ করে বলেন, তুরষ্কই একমাত্র দেশ যাহা বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিপীড়নের বিরুদ্ধে দঃসাহসী ও সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। তিনি এরদোয়ান ও তাঁর দলের নেতৃত্বকে লিবারেল জাতীয়তাবাদী টাইপ লিডারশীপ অভিহিত করে বলেন, দেশ, মুসলমান ও ইসলামের জন্য তাদের অগ্রণী ভুমিকা ও অবদান ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
জামায়াতে ইসলামী বর্তমান বিশ্বের প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক আন্দোলন।ইসলামের নামে এত বড় আন্দোলন পৃথিবীতে ইখওয়ানুল মুসলিমীন ছাড়া আর তৃতীয়টি নেই।সারা দুনিয়ার দেশে দেশে এর বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শাখা,প্রশাখা,সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষীরা আছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত এ দলটি শুরুতেই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর সহায়তা পেয়েছিল।নিছক রাজনৈতিক কারণে।জামায়াতে ইসলামী রুশ ভারতের বিরুদ্ধবাদী রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত। মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র এর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ইসলামকে মডারেট হিসাবে উপস্থাপনের কৌশল গ্রহণ করে।ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভ কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনটিতেই জামায়াত অংশগ্রহণ করেনি।তবে পাকিস্তান আন্দোলনে মাওলানা মওদুদী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন করেছেন।এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জামায়াত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে।পাকিস্তানের বিভক্তি ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আমেরিকা খুব ভাল চোখে দেখেনি।
জামায়াতকে অনেকে ইসলামী দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তারেক শামসুর রাহমানের গবেষণা কর্ম “বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলেম সমাজের ভূমিকা ও প্রভাব” গ্রন্থে যে কারণে জামায়াত কে ইসলামী দল বলতে নারাজ, তার মধ্যে বড় একটি কারণ হলো দলের সর্ব পর্যায়ে এবং জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে আলেম নেতৃত্বের ঘাটতি। এটি তাদের ভ্রান্ত চিন্তার অসারতা ছাড়া কিছু নয়।ইসলাম কে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরতে জামায়াত ই অগ্রণী ভুমিকা রাখছে।ট্রাডিশনাল ইসলামী দল কিংবা আলেমসমাজ তার সিকিভাগও করতে পারে নি।কিছু কিছু ক্ষেত্রে জামায়াত অতিমাত্রায় রাজনীতি করলেও সর্বোপরি ইহা একটি আদর্শবাদী আন্দোলন।জামায়াতের নতুন আমীরের বক্তব্যে তাই ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি জমিদার প্রথা তথা নষ্ট পরিবার প্রথার কবলে পড়েছে।জমিদার প্রথা রাজনীতে থাকতে নেই উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বিবৃতি দিয়েছেন সম্প্রতি।
স্বাধীনতার পর থেকে এই বিষয়টা জামায়াতের নেতা কর্মীরা বুঝলেও এদেশের সাধারন জনগণের উপর এর প্রভাব বিন্দুমাত্র পড়েনি। মানুষ বুঝে আওয়ামীলীগ, বিএনপি। কারণ তারা জনগণকে চায়ের দোকানে,গার্মেন্টস’র শ্রমিকদের মাঝে জনমত তৈরি করতে পেরেছে। প্রতিটা নির্বাচনে তারা মিডিয়ার মাধ্যমে জনমত তৈরি করেছে। সেগুলো প্রতিটা গ্রামে প্রচারিত হয়েছে। তবে এখন অনলাইন গণমাধ্যম ও সিটিজেন জার্নালিজম এর যুগ। আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও সোসাল মিডিয়ার এ যুগে দেশের প্রতিটা জেলাতে ব্যাপক জনমত তৈরি করতে পারলে ইতিবাচক রাজনীতির সাড়া পড়বে, সচেতন মহল তাই মনে করছেন।
“রাজনীতিতে জমিদার প্রথা থাকতে নেইঃ রাজনীতি কেবলই মানুষের কল্যাণে” ড. শফিকুর রহমান এটি দেখিয়ে দিয়েছেন। সারাদেশের বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। প্রকৃত অর্থে তিনি একজন কিংবদন্তী রাজনৈতিক, মানবিক এক নেতা। বিরল এক নেতৃত্ব।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক।