রবিবার, ১১ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৪ আগস্ট ২০২৫, ৪:১১ অপরাহ্ণ

স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিক হত্যাকান্ড

আপডেট টাইম : আগস্ট ১৪, ২০২৫ ৪:১১ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

মামুন হোসাইন: গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে কেপে উঠেছে সাংবাদিক সমাজ। গত ৭ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে ঈদগাহ মার্কেট এলাকায় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুর প্রতিনিধি মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করে ৫-৬ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। স্থানীয় চাঁদাবাজি ও ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে মোবাইলে লাইভ ভিডিও ধারণ করায় তুহিন হামলাকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ধাওয়া খেয়ে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টায় এক দোকানে প্রবেশ করলেও সেখানেই এলোপাতাড়ি কোপের আঘাতে নিহত হন তিনি। তুহিনের মৃত্যুর ভয়াবহ ভিডিও ফেসবুতে ছড়িয়ে পড়ে, যা দেখে সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তুহিনের শোকে মুহ্যমান পরিবার হারালেন এক পিতা, স্বামী ও সহকর্মীকে। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে থাকা রক্ত, ছিন্ন পোশাক আর আতঙ্কিত প্রত্যক্ষদর্শীদের দৃশ্য শিহরণ জাগায় সকলের মনে।

মাত্র একদিন আগে, ৬ আগস্ট বিকেলে গাজীপুরের সাহাপাড়া এলাকায় দৈনিক বাংলাদেশের আলোর রিপোর্টার আনোয়ার হোসেন সৌরভ একই চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় নির্মম হামলার শিকার হন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অন্তত সাত-আট জন যুবক তাকে ঘিরে ইট ও লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, মাথায় আঘাত করছে এবং পা থেঁতলে দিচ্ছে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যাওয়ার আগে তার কাছ থেকে দুইটি মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ না করায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আনোয়ারের পরিবার এটিকে সুপরিকল্পিত হামলা বলে অভিযোগ করেছেন। পরপর দুই সাংবাদিকের ওপর এ ভয়াবহ হামলা গাজীপুরের সাংবাদিক সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার নাজমুল করিম খান জানান, তুহিন হত্যাকাণ্ডে অনেকেই জড়িত এবং ইতিমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গাজীপুরকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলা হয় এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এখানে নানা অপকর্ম চালানো হচ্ছে। তুহিন ও আনোয়ারের সহকর্মীরা জিএমপি কমিশনারের কাছে দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও কঠোর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যম, পত্রিকার সম্পাদকীয় এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো একযোগে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। প্রশাসনের র‍্যাপিড রেসপন্স টিম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ হামলাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই হামলাগুলো বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের করুণ ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদের উপর শারীরিক নির্যাতন ও মামলা, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের গুম ও অমানবিক নির্যাতন এবং লেখক মুশতাক আহমেদের রহস্যময় মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় মতপ্রকাশকারীদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টার দীর্ঘ ইতিহাস। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্যও আজও অমীমাংসিত। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এই দমন-পীড়নের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা বা সংবেদনশীল বিষয় প্রকাশ করাকে অপরাধ আখ্যায়িত করে মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত করা হয়েছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, শুধুমাত্র চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসেই ১৯৬ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ৬৬ জন মারধরের শিকার হয়েছেন, সংবাদ প্রকাশের জেরে ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, ৩১ জন মব হামলার শিকার হয়েছেন, বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের হামলায় আহত হয়েছেন ১৭ জন, বিক্ষোভ-কর্মসূচিতে আহত হয়েছেন ১৩ জন এবং ৮ জন সাংবাদিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দিনেই অন্তত ১৮ জন সাংবাদিক হামলা, হয়রানি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের স্পষ্ট চিত্র।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি। এটি নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা বজায় রাখে। সংবাদমাধ্যম যখন অবাধে কাজ করতে পারে, তখনই মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি উন্মোচন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন ও ভীতি প্রদর্শন কেবল গণমাধ্যমকেই নয়, সমগ্র গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তুহিনের রক্ত ও আনোয়ারের আহাজারি স্মরণ করিয়ে দেয়: সত্য প্রকাশের জন্য জীবন দিতে হচ্ছে, যা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। সকলের প্রত্যাশা, দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাক, যাতে আর কোনো তুহিনকে প্রাণ দিতে না হয়, আর কোনো আনোয়ারকে রক্তাক্ত হতে না হয়।

শেয়ার করুন