শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

ভাইরাল হও, তবে বিচার পাবে

আপডেট টাইম : জানুয়ারি ৭, ২০২৬ ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ



শেয়ার করুন

অরণি সেমন্তি খান

রায়হানের হত্যাকারি স্বেচ্ছাচারী পুলিশ অফিসার ধরা পড়েছে। অবশ্যই এটা প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশের জনগণের জন্য এটি একটি আনন্দের দিন। নানান ইস্যুর ভীড়ে এই বিষয়টা মনে রাখা এবং একটানা কথা বলে যাওয়া, এই খুনিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আর সামনে তাকে বিচারের ট্র্যাক থেকে সরতে না দেওয়ার অন্যতম প্রভাবক হতে পারে। পুলিশই তো, বিচার হবেনা, গুম খুব সমানে চলছে আমি কেন করবোনা – এই মনোভাব সব ক্ষমতাধর ব্যক্তির- এলাকার পাতি নেতা থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের “বন্ধুরা :P” আবার পুলিশ অফিসার থেকে শুরু করে সেই কান ধরানো বা সাংবাদিক শাসানো সরকারি অফিসার। এই ভয়ংকর চক্র ভেঙ্গেই এই লোককে ধরা হয়েছে, বা ক্ষমতাধরেরা স্যাক্রিফাইজ করেছেন, যার ক্রেডিট বাংলাদেশের ইন্টারনেটের বাসিন্দাদের তথা নেটিজেনদের দেয়া যেতেই পারে। আবার কথা বলতে বন্ধ করলেই, চোখ অন্যদিকে ঘুরে গেলেই এইসব আকবরেরা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন সমাজে, সেটি বুঝে ফেলেছে নেটিজেনরা। যে, কথা বলতে থাকতে হবে।
অন্যদিকে, মনে রাখা প্রয়োজন, রায়হানকে হত্যা করে ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তার’ কথিত নির্দেশে পালিয়ে যাওয়া এসআই আকবর কিন্তু ধরা পড়ল ভারতের খাসিয়াদের হাতে। তারপরে তারা ফেরত পাঠিয়ে দিল বাংলাদেশে, যেখানে তার কৃতকর্মের ফয়সালা হবে। আমার দেশের ন্যায়বিচার আর সুবিচার নিয়ে অন্য দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে সদিচ্ছা আছে, আমার নিজের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আর প্রশাসনের সেটা থাকলে আজ এসব হত্যাই হত না, তার বিচার চাওয়া তো পরের কথা।
তবে এই সিস্টেমের একটা ভয়ংকর দিক আছেঃ একে তো “গণতন্ত্রের রোলমডেল”-এর দেশে সম্পূর্ণভাবে “জোর যার মুল্লুক তার” চলে,তার উপর যে স্বাধীন গণমাধ্যম থাকার কথা সেটা তো নাই-ই। মানুষের আস্থা এখন ফেইসবুক, সোশাল মিডিয়ায়, এবং এই ইস্যুতে লেগে থাকা মানেই হলো অনেক পোস্ট করা এবং শেয়ার করা অর্থাৎ- ইস্যুটা ভাইরাল করা। শেষমেশ কী দাঁড়ালো? বাংলাদেশের গত কয়েকটা ঘটনা, যাতে কোনো অ্যাকশন নেয়া হয়েছে, সবই ঘটনা ভাইরাল হয়ার পর। এরকম কত রায়হান বাংলাদেশে মারা যাচ্ছে, খুন হচ্ছে তার হিসেব নেই। কিন্তু তারা বিচার পায় না। যেই ঘটনা ভাইরাল হয়, তারই মর্যাদা হয় ন্যায়বিচার চাওয়ার। বাকিদের সেই গোস্তাখিও হয়না। কথিত আছে, মেজর সিনহার হত্যা কেলেঙ্কারির পরে বাংলাদেশের পুলিশ র‍্যাব সবাই ক্রসফায়ার বন্ধ করে দিয়েছিল। সেটাও ঠ্যাকায় পড়ে ইমার্জেন্সি ব্যান্ড এইড দেওয়ার মত। আসলেও কি পুলিশি নির্যাতন বন্ধ হয়েছিল? এরকম ঘটনায় বলির পাঠারা যেমন স্যাক্রিফাইজড হয়, হর্তাকর্তাদের গায়ে কি সেই তুলনায় ফুলের টোকাটাও পড়ে? নাকি তারা পুরষ্কৃত হয়?
ভাইরাল হও, তবে বিচার পাবে।
এটা কি কোন সুস্থ দেশের সিস্টেম? এই আমার পঞ্চাশ বছরের স্বাধীনতা? দেশের ২০ কোটি মানুষের মধ্যে খুব বেশি হলে ৩ কোটি আছে ফেইসবুকে, তো দেশের মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা রাখতে পারে। বা অন্তত খুন হওয়ার পরে ভাইরাল হওয়ার আশা। আশা। বিচার পাবে কিনা সেটা পরের ইস্যু। তো এই কিছু আমজনতা, আর নেতার অমুক তমুকের অমুক, এবং ঢাকার নানান উচ্চমার্গীয় চিপায় সংস্কৃতি করা মানুষ হলেই হয়ত মানুষের মতন বাঁচা যাবে। আর বাকিরা শুয়োর। নিজেদের কাঁদায় নিজেরা গড়াগড়ি খাচ্ছি। এই আমার স্বাধীনতা স্বাধীন দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

খুনী পুলিশ আকবর যখন ধরা পড়ে আর তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার সময় সে বিলাপ করছিল, “মুঝে জান ভিক্ষা দে না ভাই”। তার জান বেঁচে যাবে কিনা সেটা সময়ই বলে দিবে, কিন্তু এই পুলিশি রাষ্ট্রের অপশাসনের মধ্যে বাংলাদেশের তাবত জনগণেরও আকুতি একই রকমেরই! গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সব খর্ব হতে হতে কোনমতে জান নিয়ে বেঁচে আছি আমরা। রায়হানরা সেই জানটাও হারাচ্ছে। বাকিরা ভয়ে আছি, আমরা কবে রায়হান হব। রাষ্ট্রের কাছে আমাদেরই বরং আকুতি,
“মুঝে জান ভিক্ষা দে না ভাই!!!”

লেখক: যুগ্ম আহ্বায়ক, স্বতন্ত্র জোট।ভিপি পদপ্রার্থী, কেন্দ্রীয় সংসদ, ডাকসু নির্বাচন -২০১৯ঢাবি’র জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগের ডীনস এওয়ার্ড প্রাপ্ত প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
বর্তমানে:প্রভাষক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
(উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আছেন)

শেয়ার করুন