২১ জুলাই ২০২৩, ২:১১ পূর্বাহ্ণ
তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া: আমার আব্বা যেদিন দ্বিতীয় বিয়ে করে আনলেন আমার মা তেড়ে গিয়ে নতুন বউয়ের চুল মুঠি করে ধরলেন। অগ্নিচক্ষু নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বললেন, হারামজাদী আমার সংসার খাইতে আইছে।
বাবা কোত্থেকে চিলের মত উড়ে এসে আমার মায়ের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। ফর্সা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেল। টেনে হিঁচড়ে অন্য ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, এই পাগল মহিলারে ঘর থেইকা বাইর করছে কে?
ঘর থেকে বের করেছিলেন আমার দাদী। দাদী এই কথা বাবার সামনে বললেন না।
আমার মায়ের মাথা খারাপ সুতরাং এই পাগল মহিলা নিয়ে সংসার করা যাবে না ঘোষণা দিয়ে দাদী নতুন ছেলের বউ নিজে পছন্দ করে আনলেন।
আমার মা সব সময় পাগলামি করেন এমন নয়। মাঝে মাঝে দেখে মনে হবে পুরোপুরি সুস্থ মানুষ। ঠিকঠাক খাচ্ছে,রান্না-বান্না করছে, ঘরের সব কাজ একা করছে। আবার কিছু সময় থাকে তখন মন চাইলে সারারাত কেঁদে পার করে, কখনও পুকুরে ডুবে বসে থাকে। কেউ তুলতে গেলে চেঁচিয়ে বলবে, শরীর জ্বালা করতাছে। যাও এইখান থেইকা । আইজ সারাদিন এইখানে থাকমু।
আমার দাদী বসে বসে কপাল চাপড়াতেন আহারে এত সুস্থ সবল বউ হঠাৎ এমন পাগল হয়ে গেল কেন? জ্বিনে ধরেছে এই ঘোষণা দিয়ে বিশু কবিরাজকে আনা হলো। ঝাড়ু পেটা, শুকনা মরিচ নাক দিয়ে ঢুকানো ছাড়া আরও অনেক কারসাজি করা হলো বদ জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করতে। শেষমেশ লাভ কিছুই হলো না।
একদিন মাথায় রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া গেল পুকুর পাড়ে। সবাই বললো জ্বিন আঘাত করেছে। শতবর্ষী পুরনো পুকুর। কথিত আছে সোনার থালা -বাসন পাওয়া যেত এই পুকুরে। কতবার মানুষ জ্বিন দেখেছে এই পুকুরে। এই জ্বিন কোনোমতেই মায়ের ঘাড় থেকে নামবে না তা বুঝে গিয়েছিল সবাই।
দাদী বড় ঘর দেখে বাবাকে নতুন করে বিয়ে করালেন। দাদীর মুখে অফুরন্ত খুশির ঝিলিক। আমার মায়ের মাথা আগের চেয়ে আরও খারাপ হওয়া শুরু করলো। কাছে গেলে হাত কামড়ে ধরতেন,আঘাত করতেন। বাধ্য হয়ে মাকে ঘরে বন্দী করা হলো।
মা জানালা দিয়েই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মা আমাকে কিছু বলতো না। আঁচলের খুট থেকে দুই/পাঁচ পয়সা আমাকে দিতো।
সুযোগ পেলেই জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলতো, আমার কাছে একটু আহো মা তোমারে আদর কইরা দেই।
আমি নির্ভয়ে মায়ের কাছে যেতাম।
মা ছাড়া আমার আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় ছিল না। দুনিয়ায় থেকে আমিই জাহান্নামে চলে গেলাম। পান থেকে চুন খসলে সৎ মায়ের গালিগালাজ, মারধোর শুরু হয়। বাবার কাছে গিয়ে বানিয়ে বানিয়ে কথা বললেও বাবাও ছাড়তো না। তবে সৎ ভাইটা কেন যেন আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো।
আমি হাপুস নয়নে কাঁদলে ও কোত্থেকে আচারের প্যাকেট এনে দিয়ে বলতো, আপা বেশি ব্যথা পাইছো? আমি টলমল চোখে ওর চুলে হাত বুলিয়ে বলতাম, না পাই নাই।
আমার শৈশব কাটলো এই অসুস্থ পরিবেশে। গালি গালাজ,ঝগড়া ঝাটি, মারামারি দেখে আমর ছোট্ট মন বিষিয়ে গেল। আমার মন মগজে থিতু হয়ে গেল বিয়ে মানেই একটা অশান্তির জায়গা। পড়ালেখাও হলো না ঠিকঠাক। মোটামুটি জিপিএ নিয়ে এস.এস.সি পাস করলাম।
আমার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু হলো। না ছিল সৌন্দর্যের বাহার আর না ছিল বিদ্যাবুদ্ধি। বাবার মুখের উপর কিছু বলব সেই সাহসও ছিল না। যেদিন আমাকে প্রথম দেখতে এলো চোখের জলে সব ঝাপসা হয়ে গেল। কেন যেন মনে হচ্ছিলো আমার ভাগ্য আমার মায়ের মত হবে।
ছেলের ধান পাটের ব্যবসা আছে, শহরে মুরগির দোকান আছে। মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন আমার বাবা খুশিতে ডগমগ হয়ে রাজি হয়ে গেলেন। সৎ মা পাত্রপক্ষের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এ আমার নিজের মাইয়ার মতই। একটা ফুলের টোকা জীবনে দেই নাই।
মোটামুটি ধুমধাম করে আমার বিয়ে হলো। আমার স্বামীকে আমি অকারণে ভয় পেতে শুরু করলাম। আমার মনে হতে থাকলো সুযোগ পেলেই সে আমার গলা টিপে ধরবে। জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে হাতে ছ্যাঁকা দিয়ে দিবে।
বিয়ের পাঁচদিন পরের ঘটনা, মনির আমাকে এক গ্লাস পানি আনতে বললো। পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে গিয়ে আমার হাত ঠকঠক করে কাঁপছিল।
মনির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, রেণু কী হইছে তোমার? তুমি আমারে ডরাও ক্যান?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমি দিতে পারলাম না। অপ্রেমে যার বেড়ে উঠা প্রেম তার সহ্য হবে কেন?
সেদিন রাতেই মনির আমাকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি আরও পড়তে চাও? তোমার বান্ধবী
নাহাররে সেদিন দেখলাম কলেজে যাইতেছে। তোমার কথা জিগাইলো। তুমি যদি পড়তে চাও আমার কোনো অসুবিধা নাই। আমার অনেক পড়ার ইচ্ছা ছিল আব্বা মরার পর আর উপায় ছিল না। ইন্টার পাসের পর আর হইলো না কিছু।
বলতে গেলে মনিরের ইচ্ছেতেই আমি কলেজে ভর্তি হলাম। আমার শ্বাশুড়িরও কোনো আপত্তি ছিল না। আমি কলেজ থেকে ফিরে দেখতাম সে বাড়ির সব কাজ করে রেখেছে। গরম ভাতের প্লেট সামনে এগিয়ে দিতেই আমার ভেতরটা ঝলমল করে উঠতো।
সময়ে অসময়ে আমি শ্বাশুড়ির কোলে মাথা রেখে বলতাম, আমার মাথা ব্যথা করতাছে। একটু দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দ্যান।
আম্মা চুলে বিলি কেটে দিতেন আমার চোখ জলে ভরে যেত। আম্মা টের পেয়ে জিজ্ঞেস করতেন,কানতাছো ক্যান গো মা?
আমি সেই কান্নার কারণ বলতে পারতাম না শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতাম, আমারে কোনোদিন পর কইরা দিয়েন না৷ আপনার পায়ে একটু জায়গা দিয়েন।
সে আমাকে পায়ে নয় আজীবন বুকে আগলে রেখেছিলেন। আমি ভালো রেজাল্ট নিয়ে ইন্টার পাস করলাম এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমার চান্স হলো ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে।
মনির আর আমার শ্বাশুড়ি পাড়া সুদ্ধো মানুষকে মিষ্টি খাইয়ে বেড়ালেন। মনির আমার হাত ধরে বলল,রেণু তুমি কী চাও কও। যা চাইবা তাই দিব।
আমি মনিরকে জড়িয়ে ধরে বললাম,সব আমার পাওয়া হয়ে গেছে।
একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হিসেবে আমাকে সবাই চেনে। ছাত্র ছাত্রীদের সামনে আমার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে কখন চোখ ভিজে গেছে টের পাইনি। মনির আর ক্ষুদে ব্যবসায়ী নেই। একজন নামকরা ব্যবসায়ী হয়েছে। শ্বাশুড়ি মা আর আমার নিজের মানসিক অসুস্থ মা দুজনেই আমাদের কাছে থাকেন। রিহানের দেখাশোনা নিয়ে আমাকে আর চিন্তা করতে হয়নি।
দাদী মরণাপন্ন, লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত৷ আজকাল তার দোযখের ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার পাগলী মায়ের পা ধরে কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেলেছে। আমার মা মাফ না করলে নাকি আল্লাহও মাফ করবেন না। আবার বাবা মাথা নিচু করে থাকেন। মা, ছেলে মিলে কী এমন অন্যায় করেছিল সবার মনে এক প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নের উত্তর আমি অনেক আগেই জানতাম। কোনো অশরীরী আত্মা এসে আমার মাকে আঘাত করে যায়নি। রক্তে মাংসে গড়া মানুষেরা এর চেয়েও ভয়ঙ্কর। সে আঘাত করে তার সবচেয়ে কাছের মানুষকেই। যদি আঘাত না করে আগলে রাখে তবে আমার মত মানুষের জীবনটা স্বর্গ হয়ে উঠে। ভাগ্যিস সেই স্বর্গ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবি একই পৃথিবীতে একই পরিবারে থেকে দুজন মানুষের নিয়তির কত ব্যবধান!
Tuffahul Jannat Maria:প্রাক্তন শিক্ষার্থী, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
20/07/2023