,

2 September 2026, 3:51 AM

অপ্রাপ্ত বয়সে মানসিক সমস্যা

আপডেট টাইম : September 2, 2026 3:51 AM



শেয়ার করুন

আফতাব চৌধুরী
একটি ছেলে বা মেয়ে বেড়ে উঠতে থাকে পরিপূর্ণ ব্যাসের দিকে আর সে সময়কালটাতেই তৈরি হয় সন্ধিকাল। অনেকের মতে ১২ বা ১৩ বছর হল অপ্রাপ্তবয়স। মেয়েদের ক্ষেত্রে ছেলেদের থেকে আরেকটু কম বয়স থেকে হয়। শেষ হয় ১৮ থেকে ২১-র মধ্যে। এই যে সময়কাল সেটা খুবই সাংঘাতিক। কারণ তখন তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। তার দেহে, মনে এবং সর্বোপরে তার ব্যক্তিত্বে। ान পরিবর্তন হয়ে যায় তার জীবনের নানা দিকে। জীবনের সবচেয়ে দামি আবার বিপজ্জনক সময়কাল এটা মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিলগ্ন। তাই ওই সময় ভীষণ
ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, বিচারশক্তির বৃদ্ধি হতে থাকে তখন। সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ফলে তার আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা সব কিছুর বিস্তার হয়। সে অনেক কিছু বলতে পারে না। একটা নতুন অনুভূতি, ভালবাসা, ভাল লাগার শিরশিরানি তাকে আনমনা করে তুলে, অদ্ভূত রকমের ছটপট করে। এই বয়সের ছেলেমেয়ের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে যে একক পরিবারে মা, বাবা আর সন্তানই থাকে। যৌথ পরিবার আর সেভাবে নেই। এই একক পরিবারে বাবার থেকে মার দায় দায়িত্ব বেশি। সন্তানের ভাল-মন্দের দিকে দৃষ্টি দেওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যাপারে মাকেই বেশি দেখতে হয়। এ ক্ষেত্রে সন্তান মার মধ্যে একটা রোল মডেল খুঁজে বেড়ায়। মার প্রতিটি কথা, শিক্ষা মানুষ বানাবার আসল বুনিয়াদ তৈরি করে দেয়। তাই মার বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনা, ধৈর্য ও সুশিক্ষার উপর তাদের জীবনের অনেক কিছু নির্ভর করে। সঠিকভাবে চলতে শেখা বা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে জীবনের মোড় মারাত্মকভাবে পাল্টে যেতে পারে। এভাবে ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হচ্ছে তার শরীর, মন, যার ফলে প্রকৃতির নিয়মেই তাকে করে তুলে কৌতূহল আর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। অনেকের মধ্যে আবেগ বেশি থাকে। তাদের পদে পদে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বিপদটা ভয়ঙ্কর। মেয়েদের ১২ থেকে ২০ বছর এই সময়কালে যে ধরনের শারীরিক পরিবর্তন ঘটে তাতে মনের উপর অজানা ভয়, আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির কড়া শাসনে ফল ভাল হয় না। ছেলেমেয়ের সঙ্গে মার সম্পর্কটা হতে হবে বন্ধুর মতো। তারা যেন মাকে ভরসা করতে পারে। অনর্থক চিৎকার, বকাঝকা, ভয় দেখানোর ফল মারাত্মক হয়।
চোখে দেখা কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রসঙ্গগুলো আসছে। তাদের মতে অতিরিক্ত শাসনে তারা হীনমন্যতায় ভুগে, ধারণা জন্মে কেউ তাদের ধর্ত্যবের মধ্যে আনছে না। তখন ভীষণভাবে একাকী ও identity crisis-এর শিকার হয়। বন্ধুদের ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে অনেকের মেলে না, মা-বাবার আদর্শেও সায় দেয় না, কোন পথে এগোলে ভাল হবে বুঝতে না পেরে একাকী কষ্টে, যন্ত্রণায় ভোগে। বয়সে ছোট। তাই স্বীকৃতি বা তাদের কথার গুরুত্ব সেভাবে পায় না। এখানেই শুরু হয় মানসিক দ্বন্দ্বের। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, `in the world of human affairs there is no worse nuisance than a boy at the age of fourteen. He is neither ornamental nor useful.

দেশের বিভিন্ন শহর বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন পার্ক, লেইকও রেস্টুরেন্টে দেখা মারসিধ্যি এই বয়সের ছেলেমেয়ে একে অন্যের হাত ধরে ঘুরছে, সেটুরেন্টে যাচ্ছে। অনেকের নিষ্পাপ মুখে শুধুই সারল্যমাখা বন্ধুত্ব আবার অনেকের মধ্যে একটা মনোতার, সাবালিকত্ব পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া, চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া, মেট্রোবস্তু, ছেলেবন্ধু খুঁজে নেবার অন্য সমস্ত কিছুর মধ্যে হ্যাতো বা খুব একটা দোষণীয় কিছু নেই। কিন্তু এর সীমালঙ্ঘন করে আরও বড় কিছু এনি তারা ক ফেলে তা হলো জীবনে চরম ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। ওই বয়সে যৌন চেতনা এদের সত্তাকে এত করে যে তাতে বিপদে যাবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে যার ফলস্বরূপ অবাঞ্ছিত প্রতিক্রিয়ার বাড়ির সদস্যসের মসো মারা সম্পর্কগুলো ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। এই বয়সের ছেলেমেয়ে যে কত রকমের অপরাধ করতে পারে তা আমরা প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকাকে দেখতে পাই। একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে কেটে মেরে ফেলে অবলীলায় আবার সমাজে মুরে বেড়ায়। তখন ভাবুন সেই মেয়েটির বাড়ির পরিবেশ কী হতে পারে, গভীর র মর্মবেদনায়, পুঃখে সমাজে মুখ দেখাবার গো থাকে না। তো এরা না বুঝে এ সব করছে। ভীষণ সংবেদনশীল মন থাকে তখন মা-বাবাই পারেন উপযুক্ত বুদ্ধি আর ধৈর্য সহকারে তাদের আচার- আচরণ বা গতিবিধির উপর নজর রেখে চলার পরামর্শ দিতে। স্বভাবগতভাবে এই বয়সে লুকোচুরি খেলার আর লুকিয়ে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করার একটা লোভ থাকে। নির্দিষ্ট জিনিসের প্রতি কৌতূহল, শরীরের গভীরে পতঙ্গের মতো চটপটানি, মস্তিষ্কের রন্ধে রন্ধে তীব্র যন্ত্রণা আর বোকার মতো আবেগে গা ভাসিয়ে নিতে চার মন। নিজেকে নিয়ে শ্রিত হয়ে ভিতরে এক গভীর অন্তর্থনের দহনে পুড়তে থাকে।
বন্ধু-বান্ধব, মা-বাবা, ভাই-বোন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে চায় মন। এই সময়ে সুস্থ থাকার জন্য একটা শক্ত সামাজিক, পারিবারিক, আত্মিক বন্ধন বা সম্পর্কের প্রয়োজন। প্রজনুগত ব্যবধানের ফলে কত কিছুর মধ্যে পরিবর্তন আসে, যেমন তাদের খাদ্যাভ্যাস, চালচলন, রুচিবোধ, পোশাকে অসঙ্গতি ইত্যাদি। ১২ থেকে ১৫ বছর বা এর নীচেও ভীষণ কৌতূহলের বয়স, মন তখন ঠিকঠাকভাবে তৈরি হয় না। অনেক সময় বয়স বাড়ে অথচ মানসিক বিকাশ হয় না। যার ফলে অপসঙ্গতি অর্থাৎ maladjust-
ment হয়।
কত রকমের সমস্যা তৈরি হয় এই বেড়ে উঠার পদ্ধতির মধ্য দিয়ে, যেমন হঠাৎ করে কারণ ছাড়া রাগ করা, ঘুম না হওয়া, সিনে স্বপ্ন দেখা, নিঃসঙ্গতা, দৈহিক যন্ত্রণা, উল্টোপাল্টা যাওয়া, বাজে রকমের একটা আলস্য, চিৎকার করে কথা বলা এ সব সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফেসবুক, মোবাইল এ সব তো সর্বক্ষণ আছেই।
অনেক নিষ্পাপ ফুলের মতো ছেলেমেয়ে ক্রিমিনালের মতো শব্দ ব্যবহার করে ও উল্টোপাল্টাভাবে জীবন নিয়ে খেলা করে। সমাজের বিধিনিষেধ, আইন-কানুন ভঙ্গ করে জুভেনাইল Dilinquent childআখ্যা পায়। বাড়িতে, পথে ঘাটে এসে স্পর্ধিত ও দুঃসহ যন্ত্রণার বয়সকে নিয়ে এরা উন্মাদনায় ভোগে। তাই তো শুধু বই পড়া নয়, বাড়ির সদস্যদের মুখে মুখে সর্বক্ষণ মূল্যবোদের শিক্ষা দেওয়া উচিত। মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, স্নেহ এবং সংবেদনশীল মন আর মানবিকতা অর্থের চেয়েও অনেক দামি সেই বোধটাকে ওদের অন্তরে প্রবেশ করার মতো শিক্ষা দিতে পারলে নিশ্চয়ই ওরা প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে।
মহাপুরুষেরা বলেন প্রকৃত শিক্ষা কতগুলো শব্দের সঞ্চয়ে নয়, বরং ইচ্ছাশক্তির যথাযথ সুনিপুণ প্রয়োগে হয়। প্রত্যেকের ভেতরে একটা সুপ্ত উজ্জ্বল আলোর ছটা আছে। সেই জ্যোতি যখন তার মননে- কর্মে পড়বে তখনই এক অদ্ভুত শক্তি যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো তাদের জীবন তৈরি করতে সাহায্য করবে উন্নত জীবন যাত্রার দিকে।
কবি, সাহিত্যিক আলী আহসান বলেছেন, নেতিবাচক মনোভাব একেবারেই নয়, শুধু ইতিবাচক ভাবনা। আরও বলেছেন, আমাদের তিনটি বস্তুর প্রয়োজন অনুভব করার জন্য হৃদয়, ধারণা করার জন্য মস্তিষ্ক এবং কাজ করবার জন্য হাত-যদি তুমি পবিত্র হয়, তুমি যদি বলবান হও তা হলে তুমি একাই সমগ্র জগতের সমকক্ষ হতে পারবে। মহাজ্ঞানীরা বার বার করে বলেছেন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মপ্রত্যয়, আত্মজ্ঞান আর আত্মত্যাগের কথা। তাই জীবন যখন একটাই সেটাকে নষ্ট না করে ছোট বয়স থেকেই এই সমস্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া উচিত। অনেকের কাছে জীবন শুধু হতাশার ছবি। অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টিতে তাই সাবধানে এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। সর্বশেষে আবারও আলী আহসানের উদাত্ত কণ্ঠের বাণীটি উদ্ধৃত করি ‘সত্যকে ত্যাগ করা যায় না। সব অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর- কিশোরী, যুব সমাজ, অভিভাবক শ্রেণীর কণ্ঠে উচ্চারিত হোক এই বাণী। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম এগিয়ে যাবার রাস্তা তৈরি করার পথটুকুও তখন হয়ে উঠবে সার্থক।

লেখক:সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন