29 July 2026, 2:50 AM
তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া
প্রথম নারী ডোম হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত হলাম৷
জানি আজ থেকে অনেকেই আমাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। আমার হাতের ভাত খেতে নাক সিটকাবে, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে নাকে ওড়না ধরে থাকবে, আমার কোনোদিন বিয়ে হবে না বলে পাড়ার বুড়িরা হাসবে।
অবশ্য এতে আমার কিছুই যায় আসে না৷ ১৮ তম গ্রেডে আমার একটা সরকারি চাকরি হয়েছে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে সুখকর বিষয়।
প্রাইভেট নার্সিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম বছর খানেকও হয়নি এরই মধ্যে বাবা চলে গেলেন। মা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছেন পাঁচ বছর ধরে। আমার ছোট আরও তিনটে ভাই -বোন। বুঝতে পারছেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কাকে বলে?
অবশ্য অন্য চাকরিরও চেষ্টা করা যেত কিন্তু প্রথমবার নারী ডোম নিয়োগ হচ্ছে বিধায় সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। ও সব সুবিধার লোভ সামলাতে পারলাম না তার উপর আমার ভেতরে ডর ভয়ের কোনো বালাই নেই।
আমার ভাই বোনদের কোয়ার্টারে রাখতে পারব। আশেপাশের স্কুলে ওরা পড়বে। এমন একটা ভয়ঙ্কর পেশায় আছি শুনলে বোধ করি কোনো পুরুষও ভয়ে ধারের কাছে আসবে না।
কয়েক মাসের প্রশিক্ষণের পর আমি পুরোপুরি যোগ দিলাম চাকরিতে।
রাতের সুনসান নীরবতায় করিডোরে আমার হেঁটে যাওয়ার আওয়াজ আমিই শুনি কেবল।
আগুনে পোড়া,পানিতে ডোবা, আত্মহত্যা, খুন কিংবা দুর্ঘটনায় পড়ে থাকে লাশের সারি। কত বেওয়ারিশ লাশ নিতে আসেন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। অপরিচিত লোকও হয়ে উঠে তার পরম আত্মীয়। কী যত্ন করে নিয়ে যায় নাম জানা কত লাশকে!
মর্গে ঢোকার পরই দরজায় একটা ক্যাচ করে আওয়াজ হয়। লাশ কাটতে গিয়ে কখনও কখনও নড়ে উঠে লাশের হাত- পা। ভয় নেই কোনো প্রেতাত্মা নয়, ওটা রিগর মর্টিস। লাশের মাংসপেশী ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে ওটা তারই খেল।
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। মর্গে এক কিশোরীর লাশ এলো। তেরো / চৌদ্দ বছর বয়সী। আত্মহত্যার কেস।
মনে হচ্ছিলো, মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। তার সুদীর্ঘ চোখের পাঁপড়ি দেখে মনে হচ্ছিল, রবীন্দ্রনাথের সুভা গল্পের সুভার সেই চোখ। যেখানে রবীন্দ্রনাথ উপমা টেনে লিখেছিলেন, সুদীর্ঘ পল্লব,কচি কিশলয়ের মত ওষ্ঠ।
মেয়েটার লম্বা চুল এলোমেলো হয়ে আছে। ইচ্ছে করছিল ঝলমলে চুল আমি তেল দিয়ে বেনী করে দেই।
পোস্ট মর্টেমের আগে প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম ইনকুয়েস্ট রিপোর্টের জন্য যাবতীয় তথ্য লিখে রাখছেন। মেয়েটির বয়স, আঘাতের চিহ্ন,বর্তমান অবস্থা, আনুসঙ্গিক আরও অনেক কিছু।
মেডিক্যাল অফিসার ডা.জহির খন্দকারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ফরেনসিক টিম গঠন করা হলো। শুনেছি মেয়েটা এক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের মেয়ে।
স্টিলের এক স্ট্রেচারে মেয়েটা শুয়ে আছে। মেয়েটির নাম নিধি। ওর মুখ আর হাতের পেশীই কেবল শক্ত হয়ে আছে এর দ্বারাই বোঝা যায় মৃত্যুর আট ঘণ্টা পেরোয়নি।
রাকিবুল ইসলাম একটু কাশি দিয়ে বলা শুরু করলেন,আজকালকার ছেলে-মেয়েরা যে কীসব করে আর শেষমেশ আমাদের ভোগান্তি।
তিনি আরেকটু গলা নামিয়ে বললেন, ডা.জহির মেয়েটা কিন্তু প্রেগন্যান্ট। অবিবাহিত মেয়ে বুঝতেই পারছেন লজ্জায় গলায় ফাঁস দিয়ে বসে আছে।
ডা.জহির শুধু এইটুকু বললেন, ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই’ পোস্টমর্টেমের বিষয়টা অনেকটা এমনই।
ছাই উড়াতে গিয়ে পুলিশ অফিসারের কথার সত্যতা প্রমাণিত হলো। পেট কাটতেই তিন মাসের একটা ছোট্ট ভ্রূণ বেরিয়ে এলো।
প্যাথলজিস্ট ডা.নিহান ভ্রূণ থেকে রক্ত আর টিস্যু সংগ্রহ করে রাখলেন।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত নমুনা সংগ্রহ করা হলো। এবার সেলাই দেয়ার পালা৷
ছোট বেলায় কাপড়ের পুতুল ছিঁড়ে গেলে আমরা যেমন কোনোরকমে সেলাই দিয়ে জোড়াতালি দেই মেয়েটাকে সেলাই করতে গিয়ে আমার ঠিক তেমন মনে হচ্ছিলো। বলতে ইচ্ছে করছিল, একটা ভুল করলেই কি এভাবে শেষ করে দিতে হয় নিজেকে?
যাই হোক, খুব জোরেসোরে তদন্ত চলছিল। রিপোর্ট জমা দেয়া হলো পনেরো দিন পর৷ তদন্তকারী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম রিপোর্ট হাতে নিয়ে চোখ ছানাবড়া করে বললেন, কী আশ্চর্য! এটা আত্মহত্যা নয়। মার্ডার কেস! কীভাবে সম্ভব?
ডা.জহির ধীর গলায় ব্যাখা করলেন, মেয়েটিকে ওড়না পেঁচিয়ে পেছন দিক থেকে টেনে মারা হয়েছিল তারপর রশি দিয়ে ঝুলানো হয়।
দাগটা হরাইজোন্টাল ছিল কিন্তু ফাঁস দিলে ভি শেপের হত এবং কানের কাছে দাগটা মিলিয়ে যেত এছাড়া চোখের কনজাংটিভায় স্পষ্ট পেটিকিয়াল হেমোরেজ আছে এবং চোখের সূক্ষ্ম রক্তনালী ফেটে লাল বিন্দু তৈরি করেছে।
হাইওয়েড বোন ভাঙা ছিল নিজে ফাঁস দিলেও এই বয়সী বাচ্চাদের হাইওয়েড হাড় ভাঙার কথা নয়। স্পষ্টত লিগেচার স্ট্র্যাঙ্গুলেশন মানে অন্য কেউ মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে।
ডা. জহির মুচকি হেসে বললেন, আপনার বিস্মিত হওয়ার আরও অনেক কিছু বাকি আছে। ভ্রূণের ডিনএনএ প্রোফাইলিং করে দেখা গেছে মেয়েটির বাবা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শামসুল আলমের ডিএনএর সাথে ম্যাচ করে গেছে।
রাকিবুল ইসলাম আমতা আমতা করে বলছেন,কী বলছেন এসব?
-হ্যা, ঠিকই বলছি আপনি হয়ত জানেন না স্কুলের সার্টিফিকেটে মেয়ের বাবার নাম শামসুল আলম থাকলেও ইপিআই কার্ড মানে টিকা কার্ডে নিধির বাবার নাম আলাদা। তার নাম আবিদুর রহমান। ওর মাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি শামসুল আলম ওর সৎ বাবা।
এবার কাহিনী স্পষ্ট রেপ করার কারণে মেয়েটি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে হত্যা করা হয় এবং নিধি আত্মহত্যা করেছে বলেছে প্রচার করা হয়।
এত বিশিষ্ট একজন ব্যক্তিকে আসলে আইনের আওতায় কীভাবে নিয়ে আসা যায় সেটাই জল্পনা কল্পনা চলছিল।
নিশ্চয়ই উপর মহল থেকে চাপ আসবে। রিপোর্ট ঘুরিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে নেয়া হবে কিংবা আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে এসে দাঁপিয়ে বেড়াবে শামসুল আলমেরা।
এরই মধ্যে মিডিয়ার লোকদের মাঝে জানাজানি হয়ে গেল যে আসল খুনি কে। নিধির মা এই ব্যাপারটা শুনে পাগলপারা হয়ে গেলেন।
স্বামী মারা যাওয়ার পর অসহায় এক নারী যে কিনা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ঘর বেঁধেছিল অথচ ভেতরে ভেতরে তার সন্তানেরই ঘাতক ঘরেই বাস করবে তা তো ভাবেননি।
এত মহাচাপে শামসুল আলমের মাইনর হার্ট অ্যাটাক হলো। পুলিশি পাহারায় তার চিকিৎসা চলছিল। ওদিকে সাংবাদিকদের আনাগোনা পুরো হাসপাতাল জুড়ে। তবে সবাই বুঝেই গিয়েছিল এই লোকের কিছুই হবে না। যত আইন -কানুন কেবল আইন না বোঝা মানুষদের জন্য।
কার্ডিওলজি ২০৪ নাম্বার কেবিনে তিনদিন চিকিৎসা চললো তার। এরই মাঝে স্বস্তিকর একটা খবর টিভি জুড়ে ঘুরে বেড়ালো, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ রেপ কেসের আসামী শামসুল আলম কার্ডিয়াক ফেইলিউরে মারা গিয়েছেন। দেশ জুড়ে স্বস্তির বাতাস বইলো। স্রষ্টার ন্যায় বিচার। আইনের ফাঁক থাকলেও তাঁর বিচারে কোনো ফাঁক নেই।
আমি কেবল মুচকি হাসলাম। একজন ধর্ষক মরে গেছে তা ফলাও করে প্রচারের আড়ালে থেকে গেল এক আয়া।
যে কিনা রাতের আধারে ফিনাইল আর বালতি হাতে নিয়ে ঢুকেছিল শামসুল আলমের কেবিনে। বালতিতে ছিল পটাসিয়াম ক্লোরাইড। মাস্ক পরা সেই আয়া চট করে ক্যানুলায় পুশ করে দিলো পটাসিয়াম ক্লোরাইড।
রক্তে ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হলো দ্রুত। ইনসুলিন ওভারডোজের কারণে তৎক্ষনাৎ তার শরীরটা একবার ঝাঁকি দিলো শুধু তারপর ইসিজি মনিটর ফ্ল্যাট হয়ে গেল। মৃত্যুর পর প্রাকৃতিকভাবে কোষ ভেঙে পটাসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায় ময়নাতদন্ত করলেও অত সহজে ধরা পড়বে না।
মাস্ক পরা আয়া দ্রুত বেড়িয়ে এলো রুম থেকে। মাস্কের আড়ালে ছিল একটা সন্তুষ্ট মুখচ্ছবি। স্টোর রুমে গিয়ে আয়ার পোশাক ছেড়ে মেয়েটি ঢুকে গেল লাশঘরে৷ আজ আরও দুটো লাশ গুছিয়ে রাখতে হবে,কাল কাটবে ৷ সময় নেই। তার প্যারালাইজড মা আর ভাই -বোন অপেক্ষায় আছে কখন সে বাড়ি ফিরবে।
শোধ
তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া
২৮/০৭/২৬
লেখক :শিক্ষিকা,প্রাক্তন শিক্ষার্থী,উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।