বুধবার, ৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৮:০৭ অপরাহ্ণ

বিশ্বে ত্রিমুখী স্নায়ুযুদ্ধ ও বর্তমান পরিস্থিতি-ফনিন্দ্র সরকার

আপডেট টাইম : ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২২ ৮:০৭ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

বিশ্বে ত্রিমুখী স্নায়ুযুদ্ধ ও বর্তমান পরিস্থিতি
ফনিন্দ্র সরকার

বিশ্বে এখন স্নায়ুযুদ্ধ বহমান। বিগত দুটি বছর যাবৎ মানবসভ্যতা অচেনা জীবনঘাতী ব্যাধি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও মানবজাতির তেমন কোনো বোধোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। সাধারণত প্রকৃতির ভয়াবহ আগ্রাসি থেকে নিস্তার লাভের প্রত্যয়ে মানবজাতিকে সমুন্নত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ কালীন প্রচণ্ডতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এক ও অভিন্ন চিন্তা চেতনার আলোকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যে-যার মতো কোভিড মোকাবিলা করে যাচ্ছে। কোভিড মোকাবিলার পাশাপাশি রাজনৈতিক কূটনৈতিক নানা জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিশ্বকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করছে কেউ কেউ। ক্ষমতার দম্ভ আধিপত্য বিস্তারের অনির্বচনীয় পদক্ষেপ মানবিক উৎকর্ষ বিকাশের পথকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। ভয়াবহ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ পৃথিবীতে জীবশ্রেষ্ঠ অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণ বিসর্জিত হয়েছে। উল্লিখিত গত দুটো বিশ্বযুদ্ধে কোনো দেশেরই লাভ হয়নি, বরং ক্ষতি হয়েছে অনেক। এছাড়াও দেশে দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এর কোনটা ন্যায়যুদ্ধ, কোনটা অন্যায়ভাবে যুদ্ধ বাধানোর সাক্ষ্য বহন করে যাচ্ছে। এসব যুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘ। আমি সেদিকে যেতে চাই না। আমি বলতে চাই, সাম্প্রতিক স্নায়ুযুদ্ধ নিয়ে। কোভিডকালীন স্নায়ুযুদ্ধ কাঙ্ক্ষিত নয়। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে সশস্ত্র ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা উদ্বেগ লক্ষ করা যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান সভ্যতার যুগে সমস্ত খবর প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় সহজে। তাই যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে তা লুকাছাপা থাকছে না।

উল্লেখ্য, পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর একক মোড়ল রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা প্রবলভাবে বিকশিত হয়। সেই রাষ্ট্রটির কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কেননা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও শক্তির মূল কেন্দ্র রাশিয়া প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে সম্প্রতি দৃশ্যমান হচ্ছে। আবার এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী চীনও নানাভাবে এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। চীনের দৃশ্যমান শক্তি ও কর্মপ্রক্রিয়ায় আসক্ত হয়ে রাশিয়া চীনকে বন্ধুত্বের বাহনে আবদ্ধ করতে এগিয়ে আসছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের আধিপত্যকে আমেরিকা খুব সহজে মেনে নিতে পারছে না। এদিকে ভারতের চিরবৈরী রাষ্ট্র চীন দক্ষিণ এশিয়ার একক আধিপত্যবাদে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান-চীন বন্ধুত্ব পুরোনো। চীন পাকিস্তানের অতীত বলয় নতুন করে প্রলয়ের জন্ম দিচ্ছে। পালটে গেছে সমীকরণ। ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নবযুগের সূচনা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবুজ বিপ্লবে অংশীদারি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। তবে সত্তরের দশকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ভারতের অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র। রাশিয়া তখন সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত নেতৃত্বদানকারী দেশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বে ফাটল সৃষ্টি হয়নি কখনো। তবে বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া চীনকে বুকে টেনে ধরায় ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি স্বভাবত কারণেই পালটে গেছে। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধ এখন তুঙ্গে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে চীনের বাড়াবাড়িতে স্নায়ুযুদ্ধের ত্রিমুখী অবস্থানে বদলে গেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট। কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু ও স্থায়ী শত্রু বলে কোনো কথা নেই। রাজনীতির ব্যাকরণে এটা স্বতঃসিদ্ধ বাক্য। উল্লেখ্য, গত ৪ ফেব্র‚য়ারি ২০২২ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা ইস্যু নিয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করেন দুই নেতা। বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে পরাশক্তিধর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকটি বিশ্বরাজনীতিতে যথেষ্ট তাত্পর্যপূর্ণ বহন করে। বৈঠকটি এমন একসময় অনুষ্ঠিত হয়, যখন চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্েত যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। আবার ইউক্রেন ইস্যুতেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে। বৈঠকে জিনপিং আন্তর্জাতিক ন্যাঘ্যতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য দুই দেশের মধ্যে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ কৌশলগত সমন্বয়কে আরো গভীর করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ ও আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় একে অপরের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থকে সমর্থন করতে ঐকমত্য পোষণ করেন। চীনা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শি জিনপিং ও পুতিন বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা-সম্পর্কিত মৌলিক ইস্যুতে সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন, যা দুই নেতার ৬ হাজার শব্দের যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে খুবই বিরল ঘটনা। নতুন যুগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়নের ওপর দৃষ্টিপাত করে গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। দুই নেতার যুগপত্ বিবৃতিতে অন্তত পাঁচ বার যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে সমালোচনা করে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা আধিপত্যবাদ ও ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিরোধিতায় ভরপুর ছিল বিবৃতি। এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ন্যাঘ্যতা ন্যায়বিচার ও শান্িতপূর্ণ স্থিতিশীল বিশ্বের কথা বললেও অহেতুক লাদাখে নিয়মিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাচ্ছে তার দেশ। অন্যদিকে ইউক্রেনেও হামলার পরিকল্পনা রয়েছে রাশিয়ার—এমন ধারণা বিশেষজ্ঞদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন পুতিনের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করলে পুতিনের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার কথা বিবেচনা করবে হোয়াইট হাউজ।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, রাশিয়া যদি লাখখানেক সেনা নিয়ে ইউক্রেনের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে এটি হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আক্রমণ। এ আক্রমণ গোটা বিশ্বকেই বদলে দেবে।

রাশিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পূর্ব ইউরোপে সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের জন্যে ৮ হাজার মার্কিন সেনাকে সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। মার্কিন বিমান সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধোপকরণ নিয়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে নেমেছে ইতিমধ্যে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২০ কোটি ডলারের প্যাকেজের তৃতীয় চালান। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্যমতে, ইউক্রেনে প্রতিরক্ষা জোরদারেই উল্লিখিত অঙ্কের সামরিক সহায়তা। আবার ন্যাটো বাহিনীও প্রস্ত্তত রয়েছে বলে জানা গেছে। যেখানে রাশিয়া, ইউক্রেন সমস্যা কূটনৈতিক আলোচনার ভিত্তিতেই সমাধানযোগ্য, সেখানে পারস্পরিক সামরিক মহড়া যুদ্ধ-ইঙ্গিতই বহন করছে। আর তাই বিশ্ব চমকিত। বিশেষজ্ঞদের ধারণা রাশিয়া চীনের দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সহযোগিতার মধ্যে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। দুই পরাশক্তির বোঝাপড়ার উচ্চমাত্রা দেখে যুক্তরাষ্ট্র কী ভীত হয়ে পড়েছে? এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। এদিকে চীন ভারতের সঙ্গে যে আচরণ করছে তা রাশিয়া কি সমর্থন করছে? এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। সুতরাং ত্রিমুখী স্নায়ুযুদ্ধের উৎতাপ ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অংশ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ স্নায়ুযুদ্ধের উৎতাপে খুব একটা চিন্িতত বলে মনে হয় না। দেখা যাচ্ছে, ভারত-চীনের যুদ্ধাবস্থাকে খুবই সরলীকরণ করে ভারসাম্যের নীতিকে সমৃদ্ধ করছে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে যতটা তত্পর ঠিক ততটাই ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে সোচ্চার। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে চীন বিরোধিতা করলেও বর্তমানে উন্নয়ন সহযোগিতায় অগ্রবর্তী। আবার জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশের পাশে থেকেছে ভারত। স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা চিরস্মরণীয়। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতাবোধ থাকলেও নতুন ভাবোদয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা প্রশ্ন জেগেছে, এ প্রশ্নের সমাধান জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, আধুনিককালে ভারত পাশ্চাত্যের মধ্যে এক নতুন সামঞ্জস্য বিধানে তত্পর রয়েছে। ভারত মনে করে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে আসবে নতুন সংস্কৃতি ও বিশ্বজনীন সচেতনতা সেই সঙ্গে সমাজে আসবে শান্িত, প্রতিষ্ঠিত হবে সংহতি ও মৈত্রী। ভারতীয় সমাজতত্ত্বে যে মানবীয় আদর্শ রয়েছে তা পৃথিবীর প্রত্যেক সমাজেরই উচিত, এটিকে নিজের আদর্শ ও লক্ষ্যরূপে ধরে রাখা। ভারতীয় দর্শনের মূল উপাত্ত হচ্ছে কীভাবে ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্হে্যর উন্নতি ঘটানো যায়! ভারত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যই হলো জনগণের মর্যাদা বৃদ্ধি করা। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যেই কথাটি প্রযোজ্য। ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশে একসময় দখল ও কুক্ষিগত ক্ষমতার সংস্কৃতি চালু ছিল। সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক পরিবেশকে যতটা উন্নীত করা দরকার ছিল তা হয়নি এখনো। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে যাজ্ঞিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করতে হবে। বর্তমানে চীন-ভারত ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করতে হবে। চীন আমাদের বন্ধু বটে, তবে পরীক্ষিত নয়। অতীত ইতিহাস সেটাই বলে। ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু হলেও নতজানু দৃষ্টিভঙ্গি যদি থাকে তা পরিহার করতে হবে। বৈচিত্র্যময় এই বাংলাদেশের সার্বভৌমিক একত্বের কথা মাথায় রেখেই আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় শুধু দুঃখই জেঁকে বসবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন