,

2 September 2026, 4:18 AM

তামাবিল স্থলবন্দরে মিথানল : নিরাপত্তার ঘাটতির মধ্যেই বাড়ছে আমদানি, নেপথ্যে কারা?

আপডেট টাইম : September 2, 2026 4:18 AM



শেয়ার করুন

 

নিজস্ব ফায়ার স্টেশন নেই, নেই কেমিক্যাল ল্যাব-দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে শঙ্কা

মোঃ সাজ উদ্দিন, স্টাফ রিপোর্টার

সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর। প্রতিদিন ভারত থেকে পাথর, কয়লা ও বিভিন্ন পণ্যবাহী শত শত যানবাহন প্রবেশ করে এই বন্দর দিয়ে। এরই মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে উচ্চমাত্রায় দাহ্য ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিথানল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে- এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো কি তামাবিল স্থলবন্দরে রয়েছে? সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আগে সপ্তাহে ৪-৫টি মিথানলবাহী ট্যাংকলরি তামাবিল স্থলবন্দরে প্রবেশ করলেও বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭-১০টি গাড়িতে মিথানল আসছে। বন্দরের ভেতরেই ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে রাসায়নিক স্থানান্তর করা হয়। নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ল্যাব বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফল পেতে প্রায় দুই দিন সময় লাগায় এ সময় মিথানলবাহী কনটেইনার বন্দরে অবস্থান করে। এখানেই সামনে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এতো বিপজ্জনক রাসায়নিকের জন্য স্থলবন্দরে কি পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা রয়েছে? ফায়ার স্টেশন নেই, ঝুঁকিতে শ্রমিক-চালক: তামাবিল স্থলবন্দরে বর্তমানে নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে স্থলবন্দরের ভেতরে মিথানলবাহী কোনো লরি বা কনটেইনারে বড় ধরনের আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কতটা সম্ভব-এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থলবন্দরের ভেতরে প্রতিদিন শত শত শ্রমিক ও চালকের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক যানবাহনের উপস্থিতি থাকে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু রাসায়নিকবাহী যান নয়, আশপাশের অন্যান্য পণ্যবাহী যান ও স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০২৪ সালের আগুন কি সতর্কবার্তা ছিল? ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর তামাবিল স্থলবন্দরে একটি ভারতীয় মিথানলবাহী লরির সামনের অংশে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই স্থলবন্দরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশে থাকা অন্যান্য মিথানলবাহী লরি, পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ডাউকি স্থলবন্দরের ফায়ার সার্ভিসের একটি পানিবাহী গাড়ি এসে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই ঘটনা বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য ঝুঁকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো- দুই বছর পরও স্থলবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা আধুনিক ও কার্যকর হয়েছে? স্থলবন্দরে নেই রাসায়নিক পরীক্ষার নিজস্ব ল্যাব: মিথানলের মতো রাসায়নিক পদার্থের নমুনা পরীক্ষার জন্য তামাবিল স্থলবন্দরে নিজস্ব কেমিক্যাল ল্যাব নেই। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নমুনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত পরীক্ষাগারে পাঠায়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, পরীক্ষার ফলাফল না আসা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকবাহী কনটেইনার স্থলবন্দরের ভেতরে অবস্থান করে। এতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। হঠাৎ কেন বাড়ল মিথানল আমদানি? তথ্য বলছে, তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে মিথানল আমদানির পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। একসময় যেখানে সপ্তাহে কয়েকটি ট্যাংকলরি আসত, সেখানে এখন প্রতিদিনই একাধিক গাড়িতে মিথানল আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন- দেশের অন্যান্য স্থলবন্দর থাকা সত্ত্বেও তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে মিথানল আমদানি কেন বাড়ছে? স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি এ আমদানির সঙ্গে যুক্ত নয়। ঢাকার দুটি গ্রুপ নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিথানল আমদানি করছে। স্থানীয় পর্যায়ে শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছেন, আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমানভাবে জোরদার করা প্রয়োজন। আমদানির অনুমোদন, পণ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়া, সংরক্ষণ এবং খালাস-প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও পলিমার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাস্তাবুর রহমান জানিয়েছেন, মিথানল উচ্চমাত্রায় দাহ্য রাসায়নিক। তাই যথাযথ নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই এটি আমদানি ও ব্যবস্থাপনা করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথানলের মতো রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় শুধু আমদানির অনুমোদন থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; নিরাপদ পরিবহন, স্থানান্তর, সংরক্ষণ এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি। কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন প্রকল্পে থাকবে ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা: তামাবিল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মিথানল আমদানির অনুমতি এনবিআর থেকে দেওয়া হয়। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে অনুমোদিত পণ্য আমদানি বন্ধ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, স্থলবন্দরে ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে কে? মিথানল আমদানি বৈধ কি না-তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটি কতটা নিরাপদভাবে আমদানি ও ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। স্থলবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা, রাসায়নিক পরীক্ষার সক্ষমতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আমদানির পরিমাণ- সবকিছু সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি ট্যাংকলরি বা কনটেইনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তামাবিলের মতো ব্যস্ত স্থলবন্দরে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে এর প্রভাব পড়তে পারে শত শত শ্রমিক, চালক, ব্যবসায়ী ও বন্দরে থাকা বিপুলসংখ্যক যানবাহনের ওপর। তাই প্রশ্নটি এখন শুধু ‘মিথানল কেন আমদানি হচ্ছে’-এমন নয়; বরং ‘যে ঝুঁকি নিয়ে মিথানল আমদানি হচ্ছে, সেই ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা আছে?’ এই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও কার্যকর উত্তরই এখন তামাবিল বন্দরের নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শেয়ার করুন