28 August 2026, 11:32 PM
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল মালিক নোবেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের University of Gloucestershire থেকে International Business-এ দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করতে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। কিন্তু একাডেমিক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর আরেকটি পরিচয় ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে—তিনি একজন Contemporary Watercolour Artist।
আর সেই শিল্পীসত্তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথেই এবার যুক্ত হলো তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন—যুক্তরাজ্যের Global Talent Visa-এর Exceptional Promise (Arts and Culture) ভিসা।
এই অর্জনের বিশেষত্ব শুধু একটি ভিসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। Global Talent route যুক্তরাজ্যে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক অভিবাসন পথ। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে শুধু ভালো ছবি আঁকতে পারা নয়, বরং তাঁর দীর্ঘমেয়াদি শিল্পচর্চা, প্রদর্শনী, পুরস্কার ও স্বীকৃতি, পেশাগত সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের প্রমাণ, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাসহ সামগ্রিক শিল্পীসত্তাকে মূল্যায়ন করা হয়।
আব্দুল মালিক নোবেলের শিল্পীজীবনের অর্জনের তালিকাটিও বেশ সমৃদ্ধ। যুক্তরাজ্যে তিনি Royal Society of British Artists (RBA)-এর প্রদর্শনীতে De Laszlo Foundation Award-এ Highly Commended, Broadway Art Festival-এ Highly Commended, একাধিক Plein-Air Art Competition-এ Overall Winner, Urban Artwork Award-সহ বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এছাড়াও লন্ডনের Chelsea Art Society-এর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশে থাকাকালীনও তাঁর শিল্পচর্চা পেয়েছে জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি। ২০১৯ সালে Transparency International Bangladesh (TIB) আয়োজিত দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত বন্ধন চারুকলা প্রদর্শনীতে জলরঙ মাধ্যমে Best Award এবং PRAN-RFL Rainbow Paints আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জনসহ রয়েছে আরও নানা পুরস্কার ও সম্মাননা।
Global Talent Visa-এর আবেদনে তাঁর জন্য বিশেষ ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাজ্যের শিল্পাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দেওয়া তিনটি Recommendation Letter। এর মধ্যে ছিলেন প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী Royal Society of British Artists (RBA)-এর President Michael Harrison PRBA, শতবর্ষেরও পুরোনো Chelsea Art Society-এর President Susanne Machinnes PCAS এবং বিশিষ্ট ব্রিটিশ শিল্পী Richard Thorn RI।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছেন বাংলা বিভাগে। পরবর্তীতে International Business-এ উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। অথচ এর কোনোটিই তাঁর শিল্পীসত্তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চারুকলা না পড়েও তিনি নিজের দীর্ঘদিনের চর্চা, পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
নিজের এই অর্জনকে তাই তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না। তাঁর ভাষায়, চারুকলায় পড়তে না পারা ছিল একসময় তাঁর আজীবনের আফসোস। কিন্তু ছবি আঁকা তাঁকে কম কিছু দেয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আফসোস ম্লান হয়ে গেছে তাঁর অর্জনের কাছে।
বাংলা, বিজ্ঞান, ব্যবসা কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা করেও একজন মানুষ তাঁর ভালোবাসার ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে পারেন। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চর্চা, নিজের কাজকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, ধারাবাহিকতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজের স্বপ্নকে অসম্ভব মনে না করা।
আব্দুল মালিক নোবেলের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর শিল্পচর্চা, অসংখ্য প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা, নিরলস পরিশ্রম এবং প্রবাসজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ছবি আঁকা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা। পাশাপাশি পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রিয়জনদের দোয়া ও সহযোগিতার কথাও তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন।
ছোটবেলায় বড় ভাইয়ের উৎসাহে রংপেন্সিল হাতে নেওয়া, প্রথম জলরঙ কিনে দেওয়া ছোটমামা, পরিবারের নিরন্তর অনুপ্রেরণা—সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একসময় তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনের বড় স্বীকৃতির সামনে। এ যাত্রায় পাশে সর্বক্ষেত্রে পাশে পেয়েছিলেন নিজের বাবা-মা, বড় ভাই, স্ত্রী ও নিজ বিভাগের প্রাণপ্রিয় শিক্ষকদের।
আজ তিনি যুক্তরাজ্যে Contemporary Watercolour Artist হিসেবে কাজ করছেন। সামনে তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—নিজের শিল্পচর্চাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করা এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করা।