15 February 2025, 12:03 AM
তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া
বেঁচে থেকে আর কোনো লাভ নেই। কিছু কিছু সময় আসে যখন মন উত্তর খুঁজে বেড়ায় কী হবে আর এই নষ্ট পৃথিবীতে থেকে? ভোরের আলো, তারার মিটমিট,শিউলীর ঘ্রাণ, ঘুঘুর ডাক সবই অসহ্য লাগে! ভীষণ আক্ষেপ,ক্ষোভ, নিজের প্রতি যত অবিচার, যন্ত্রণা সব একটা খাতা খুলে লিখলাম। টপ টপ করে পড়া চোখের জলে খাতার পাতাটা ভিজে গেল ।
পড়াশোনা শেষ করা চাকরিহীন মেয়ে, বিয়ের বয়সী বিয়েহীন এক নারী, সৌন্দর্যের বিচারে পেছনের সারিতে থাকা এক নারী, ভুল ভালো লাগায় অবহেলিত,অপদস্ত এক নারীর কাছে জীবন তখন ঝরা ফুলের মত।
সেই অবহেলিত পাঁপড়ি কুড়িয়ে কেউ ঘ্রাণ নেয়নি,সযতনে এনে ফুলদানীতে রাখেনি। সেই পাঁপড়ি পিষে গেছে তুমুল
অযত্নে।
ছাদের কিনারে এসে তখন ব্যাকুল হয়ে কাঁদছি। আমাকে তখন লাগছিল একটা বিধ্বস্ত পাহাড়ের মত। কী ভেবে ফোনটা হাতে নিলাম। মনে হলো একজন অন্তত জানুক আমি এই পৃথিবীর এক উচ্ছিষ্ট। আমি চলে যাচ্ছি।
ফোনটা হাতে নিয়ে নাঈমকে ফোন দিলাম। ও আমার দশ বছরের বন্ধু। ফোন দিয়ে কোনো কথা বলতে পারছিলাম না৷ পাড় ভাঙা নদীর মত ভেঙে যাওয়া এই আমি অজানা এক স্রোতের মত ভেসে যাচ্ছি তা ও বুঝেই গেল৷
সব সময় তাকে পেয়েছি পরম আশ্রয় হিসেবে৷ কখনও কখনও মনে হত কী এমন হয় যদি তাকে চিরদিনের জন্য পাই পরক্ষণেই মত হত সে আমার অতি শ্রদ্ধেয়, অনন্য আসনে সেই আসন থেকে সরে গেলে আমার কষ্ট হবে, দম বন্ধ হবে। ক্যাকটাসের কাঁটার মত ঘ্যাচ করে কোথাও বিঁধবে।
এই আশঙ্কা, ভয় নিয়ে দূরে দূরে থাকতাম। নাঈম যে আমাকে ভালোবাসতো তা আমি বুঝতাম কিন্তু সেভাবে সরাসরি কখনও বলেনি।
নাঈম কখনও হাসতে হাসতে বলতে, শেষ বিকেলের নায়িকার মত শেষমেশ আমার গলাতেই তোকে ঝুলতে হবে।
আমিও হেসে হেসে উত্তর দিতাম,তাই হবে মনে হচ্ছে।
এরপর মন খারাপ হলে ওকে ফোন দিতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হত। খেয়াল করতাম ওর সাথে কথা বললে আমার এত প্রশান্তি লাগে!
কী একটা বাঁধা, কী একটা অজানা শঙ্কায় আমি ওকে বন্ধুত্বের বাইরে আর কিছু ভাবতে চাইনি। তুমুল অবহেলায় যে ফুল ঝরে গেছে তা তার পাঁপড়িগুলো ঝরাই থাকুক না!
সেদিন রাতে কান্নাভেজা এই আমাকে হঠাৎ করে বলে ফেললো, ফারিয়া জানিস তুই আমার একটা আয়না সেখানে আমি আমাকে দেখতে পাই। আমি আমার আমিকে আজীবন তোর মাঝে দেখতে চাই।
আমি কতক্ষণ চুপ করে রইলাম। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তারপর কী করে যেন বলে ফেললাম, আমরা সেই আয়নাই কাছে রাখি যেখানে আমাদের নিজের প্রতিচ্ছবি সবচেয়ে স্বচ্ছ লাগে।
এরপর নিজের ভেতরে তুমুল তোলপাড় হলো। ভাবলাম দেখি না আরেকটু বাজি ধরে। একটাই তো জীবন। আর তো ফিরে আসবে না। কেমন হয় একটা জীবন এমন একটা মানুষের সাথে কাটিয়ে দিলে যে শুক্তোর মত আগলে রাখতে জানে।
পাঁচদিন পর একটা চিঠি লিখলাম ওকে।
প্রিয়,
এখন রাত একটা বাজে। কিছুতেই ঘুম আসছে না,পড়তেও পারছি না। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে অবিরাম। ভ্যাপসা গরম। খুব জানতে ইচ্ছে করছে কী করছো তুমি?
ঘুমিয়ে গেছো? এভাবে তুমি বলে ডাকিনি কোনোদিন তাই না?
তোমার আমার ছবিটা দেখলাম। জুম করে তোমাকে দেখতে দেখতে মনে হলো এভাবে কেন আগে দেখিনি?
হৃদয়ের এত কাছে রেখেও কেন এতকাল দূরের করে রেখেছিলাম? আমাকে যে এত বছর ধরে জানে সে আমার ভেতরটা জেনে ফেলেছে। প্রিয়,ভীষণ অস্থির সময়ে তোমাকে পেয়েছি,ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছি। অমন করে কাঁদিনি কারো কাছে।
এখন দিন-রাত জানতে ইচ্ছে করে তোমার বুকের উষ্ণতা কেমন। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ লুকাতে ইচ্ছে করে বিড়াল ছানার মত৷ ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। বলতে ইচ্ছে করে কেন এভাবে আগে চাইলে না আমায়?
বলতে ইচ্ছে করে জল জোছনার ধারে একটা ছোট্ট ঘর হোক। উঠোন জুড়ে থাকুক শিউলী। তুমি মুঠো ভরে তা এনে দিয়ো। আমি গালে ছুঁয়ে বলব জীবন সুন্দর! অসম্ভব সুন্দর!
যে সম্পর্কের নাম ছিল না তার নাম দিয়ে দিলাম। যে কথা কক্ষনো বলিনি সংকোচ, লজ্জা, অতীত, ভবিষ্যত ভাবনা কিংবা ভীরুতায় যা এতকাল বলা হয়নি তা আজ আমি দ্বিধাহীনভাবে বলে দিলাম, “ভালোবাসি প্রিয়”।
চিঠিটা পেয়ে নাঈম সেদিন ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছিল। আমি অবাক হয়ে ভেবেছিলাম, আমার জন্যও কেউ কাঁদতে পারে!
পড়াশোনা শেষ হওয়া একটা মেয়ে যার ক্যারিয়ার নেই, সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে যে পিছিয়ে, কাঁটার মত এসেছে ভুল প্রেমের অবহেলা তাকে কেউ আগলে রাখতে পারে তা কেন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগতো আমার।
নাঈমকে পাওয়ার পর এত উচ্ছ্বাস, তুমুল আনন্দ, সম্মানের আসনে বসে থেকে মনে হয়েছে কেন তার জীবনে আগে এলাম না!
আমার সাথে একদিন কথা না বলতে পারলে ও অস্থির হয়ে যেত৷ একদিন ভোর রাতে কী নিয়ে ঝগড়া হলো ও সারারাত না ঘুমিয়ে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেললো।
প্রতিদিন দুপুর বেলা ওর ফোনের জন্য আমার অপেক্ষা শুরু হত। ওর কণ্ঠ না শুনলে পাগল পাগল লাগতো। আমি আবার আমিকে খুঁজে পেলাম। এত উচ্ছ্বাস, আনন্দ আমার জীবনে আর কখনও আসেনি।
চোখের পলকে কখন ছয়টা মাস কেটে গেল বুঝিনি। বাসা থেকে বিয়ের জন্য তোড়জোড়। নাঈমের তখনও চাকরি হয়নি। আমার তো এই এক জীবনে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু কাঙ্ক্ষিত ছিল না তাই মাঝে মধ্যেই বলতাম, তোমার সাথে গাছ- তলাতে থাকতেও রাজি।
একটা মেয়েকে স্বস্তির জায়গা দিতে নাঈমের অনেক বেগ পেতে হলো। পরিবার, সমাজ সবকিছুর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে এলো। একজন বেকার ছেলের পক্ষে তার পরিবারকে বোঝানো একটা মেয়ের দায়িত্ব সে নিতে চায় এমন বলাটাই তো অসীম সাহসিকতা।
সবকিছু ছাপিয়ে তার প্রিয়তমার একটুখানি স্বস্তি, শান্তিই বড় হয়ে দাঁড়ালো। কোনো এক হিম হিম শীতের আমেজ আসা মুহূর্তে সে চিরদিনের জন্য আমার হয়ে গেল। এই তুমুল আনন্দ নিয়ে জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
সেই আগের আমাকে ইরেজার দিয়ে মুছে প্রিয় মানুষটার হাত ধরে সবকিছু ভুলে আবার নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
যে পড়ালেখার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম তা আবার শুরু হলো। বহুদিন পর ডায়েরি খুলে লিখলাম সেই ছন্দ যে ছন্দ হারিয়ে গিয়েছিল অতলে।
প্রিয় মানুষটা মাথায় হাত রাখলে ডুকরে কেঁদে উঠি মনে হয় ঘড়ির সময়টা থেমে থাক। এভাবেই কাটুক না অনন্তকাল।
একদিন বললাম চলো বইমেলায় যাই। সেখানে গিয়ে একটা বই ওর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, উদ্ধোধন তুমি কর। মোড়ক খুলে দেখে আমারই বই। যে লেখা ভুলেই গিয়েছিলাম তা আবার লিখছি, উৎসর্গ আবার প্রিয় স্বামীরই নামে। হঠাৎ করে চমকে দেয়ায় ও যে কী খুশি এর মাঝে কলেজের একটা চাকরিও যে হয়েছে তা সেদিনই বললাম।
এই মহানন্দে নাঈম আমাকে নিয়ে গেল দার্জিলিং। টাইগার হিলে দাঁড়িয়ে ওর ঠান্ডা হাত ছুঁয়ে গেয়ে ফেলি,তুমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়।
কনকনে হিম হাওয়ায় কাঁপন ধরে যাচ্ছে তবুও তার মাঝেও আমার প্রবল উচ্ছ্বাস। সেই প্রবল উচ্ছ্বাসের মাঝে নাঈমের কানে কানে জানালাম এর চেয়েও চমৎকার উপহার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। উপহারের জন্য অবশ্য তোমাকে নয় মাস ধৈর্য ধরতে হবে৷
নাঈমের চোখজোড়া জলে ভরে গেল। আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে,আজীবন আমার কাছে ছায়া হয়ে থেকো।
আমার মত অতি সামান্য নারীকে পেয়ে তার চোখের জল ছুঁয়ে বলতে ইচ্ছে করে, মাই লর্ড আমি ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকা এক যুবকের কান্নার অর্থ বুঝেছি ঐ চোখজোড়া দেখে দেখে আমার মৃত্যু হোক।
লেখক:Tuffahul Jannat Maria
EX-student:University of Dhaka.
Dept. Of Botany.
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫