রবিবার, ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৫ জুন ২০২৩, ৫:৫৫ অপরাহ্ণ

মোহ

আপডেট টাইম : জুন ১৫, ২০২৩ ৫:৫৫ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া

আমি প্রেমে পড়লাম আমার দুলাভাইয়ের। বোনের স্বামীর প্রেমে পড়াটা সামাজিক দৃষ্টিকোণে অন্যায় এবং গর্হিত কাজ হলেও আমার টালমাটাল মনকে সামাল দেয়া ভীষণ কঠিন কাজ ছিল।

মুনতাসির ভাইয়ের কাছাকাছি গেলেই মনে হত এই মানুষটার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল অথচ বিয়ে হলো বড় আপুর সাথে। মনে হতে থাকে আমার মধ্যে কীসের কমতি ছিল? সৌন্দর্যের দিক থেকে আমি আপুর চেয়ে এক কাঠি উপরেই ছিলাম আর সেই কারণে সাবিরা আপুকে দেখতে এসে ভাইয়ার মা-বাবা আমাকে পছন্দ করে ফেলেন।

আমি সবেমাত্র কলেজে উঠেছি। আপু তখন মাস্টার্স করছে। আপুকে রেখে আমাকে বিয়ে দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। মুনতাসির ভাই তার মা-বাবার ঘোর বিরোধিতা করলেন এবং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন বিয়ে যদি করতেই হয় তবে সাবিরা আপুকেই করবেন।

একজনকে দেখতে এসে অন্যজনকে পছন্দ করার ব্যাপারটা নিয়ে আপুর আত্মসম্মানে লাগলো। সে মুনতাসির ভাইয়াকে ফিরিয়ে দেয়ার পরও ভাইয়া গোঁ ধরে বসে রইলেন। শেষমেশ কেন যেন আপুও রাজি হয়ে গেলেন।

তখনও আমার কাছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হয়েছে বরং ভাইয়ার মা-বাবা কেন এমন বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন তা নিয়েই মন খারাপ হত শুরুতে তবে ধীরে ধীরে আমি টের পেলাম আমি মুনতাসির ভাইয়ার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
আপুকে সে এত যত্ন করেন এত ভালোবাসেন আমার মনে হতে থাকলো এই ভালোবাসা আমার হতে পারতো।

বৃষ্টি ভীষণ ভয় পাই তবুও ইচ্ছে ছিল বৃষ্টিতে ভেজার। জোছনা রাতে নৌকা নিয়ে দূরে, বহুদূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে। ধানক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হতে থাকে জল জোছনায় খেলা করা নদীর ধারে একটা ছোট্ট ঘর আমাদেরও হতে পারতো। উঠোন জুড়ে থাকতে পারতো শুভ্র শিউলীর মেলা।

সেখান থেকে মুঠো ভরা ফুল সেও কুড়িয়ে আনতে পারতে। সে ফুল ছুঁয়ে হয়ত ভাবতাম জীবন সুন্দর, অসম্ভব সুন্দর!
কিন্তু কী আশ্চর্য আমার কখনও সেই ফুল ছোঁয়া হবে না, আমি কেন কখনও তাকে পাব না?

আমি এই মুহূর্তে আপুদের বাসায় আছি। আপু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তাকে দেখাশোনার জন্য আমিই এলাম। বাবা অসুস্থ থাকায় মা আসতে পারলেন না। ক্রমে ক্রমেই আমি মুনতাসির ভাইয়ার প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ি এবং মনে হতে থাকেও সেও আমাকে ভালোবাসে। আপুর সাথে ভাইয়ার অমিল আমি বুঝতে পারি৷

আপু কখনও বৃষ্টিতে ভিজে না, মুভি দেখে না,আমার মত এত চঞ্চলও নয়। ভাইয়ার একদম উল্টো।

এই যে সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো ভাইয়া খুব খিচুড়ি খেতে চাচ্ছিলেন আপু শুরু করলো ঝগড়া। কাটা কাটা গলায় বললেন, তোমার বিবেক দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। আমি এই অসুস্থ শরীর নিয়ে একগাদা রান্না করেছি এখন আমি আবার খিচুড়ি রাঁধতে যাব?

আমার মন খারাপ হয়ে গেল। ঘণ্টাখানেক পর আমি আনাড়ি হাতে নিজেই তার জন্য রান্না করে নিয়ে আসি। খিচুড়ি দেখেই ভাইয়া খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন, এই না হলো শ্যালিকা। থ্যাংকিউ।

আমার অদক্ষ হাতের রান্না খেয়েও সে প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সুযোগ পেলেই আমি তার কাপড় ধুয়ে দেই, জুতো মুছে দেই। এক অসম্ভব ভালো লাগায় আমার ভেতর বাহির ছেয়ে থাকে।

একদিন গভীর রাতে আমার ঘুম আসছিল না। ছাদে গিয়ে দেখি ভাইয়াও পায়চারি করছেন। আমাকে দেখেই চমকে উঠে বললেন,কী ব্যাপার সাবিহা ঘুমাওনি এখনও?
-ঘুম আসছে না। আপনি এত রাতে কী করছেন?
ভাইয়া মন খারাপ করে বললেন, আর বলো না তোমার আপুর কাছে ঘুমোতে গেলেই খিটখিট করতে থাকে। তাই এখানে এসেছি। আচ্ছা দাঁড়াও চা বানিয়ে নিয়ে আসি তারপর গল্প করি।

সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করলাম। তার ঝলমলে চুল বাতাসে উড়ছিল। ছেলেদের মাথার সুন্দর চুল নিয়ে আমার ভয়ঙ্কর আকর্ষণ আছে। কুচকুচে রেশমের মত চুল বাতাসে উড়তে দেখতে দেখতে ইচ্ছে করছিল এক জীবন পার করে দেই৷

মাঝে মাঝে মুনতাসির ভাইয়াকে আমি বুঝতে পারতাম না। সে কি আমাকে ভালোবাসে?
ঐ যে সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর এলো সে গভীর রাতে গিয়ে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে এলো। থার্মোমিটার মুখে পুরে দিয়ে অস্থির হয়ে উঠলো। তখন ইচ্ছে করছিল তার হাতটা টেনে আমার কপালে রেখে বলি, হাত দিয়ে মেপে দেখুন তো আমার জ্বর কত?

আপু তখন ঘরের কাজ খুব একটা করতে পারতো না। আমি পাকা গিন্নির কত সব কাজ করতাম। সব সময় ভাইয়ার যত্ন করতাম। একদিন বিকেল বেলা আমি চা বানিয়ে আপুর ঘরে গেলাম দেখলাম আপু ঘরে নেই। সম্ভবত রান্না ঘরে। ভাইয়া ঘুমাচ্ছিলেন।

তার সেই মায়াবী মুখটা আমার ভেতরে তোলপাড় করে দিল। আমার মনে হতে থাকলো তিনি একটা তৃষ্ণার্ত পায়রার মত ভেতরে ভেতরে ছটফট করছেন। কী মনে করে আমি ওড়নাটা খুলে পাশের রুমে রেখে এলাম। তারপর পাশে বসে তাকে ডাকলাম,ঘুমিয়ে গেছেন? চা খাবেন না? ঠান্ডা হয়ে গেল তো।

সে ঘুম থেকে উঠে চা হাতে নিয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। সেই হাসির রহস্য আমি বুঝতে পারছিলাম৷।

এরপর আপু একদিন শপিং করতে গেলেন। আমি ইচ্ছে করেই আপুর সাথে গেলাম না। আমি এর মাঝে ভাইয়ার সব পছন্দের খাবার রান্না করে রাখলাম। অফিস থেকে ফিরে সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আমি শরবত বানিয়ে দিলাম। এর মাঝেই জিজ্ঞেস করলো, তোমার আপুকে দেখছি না যে?
-আপু শপিং করতে গেছে?
ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন, তুমি গেলে না?
-উহু,আমার খুব মাথা ব্যথা।
ভাইয়া মুচকি হেসে বলল, সাবিহা তোমার সাথে কিছু কথা আছে। কিছুক্ষণ পর আমার রুমে এসো। আমি খুব টায়ার্ড। একটু পর এসো।

আমি কিছুক্ষণ পর তার রুমে গেলাম। ভাইয়া চেয়ার দেখিয়ে বললেন, এখানে বসো। তোমার মাথা ব্যথা কমেছে?
আমি মাথা নেড়ে বললাম,হ্যাঁ কমেছে।
ভাইয়া মৃদু গলায় বললেন,তোমার মাথা মাথা ছিল না আমি জানি। প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে কেউ এত সুন্দর করে চোখে কাজল দেয় না৷ আমি খানিকটা লজ্জা পেলাম।

ভাইয়া হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সাবিহা তোমার বয়স কত যেন?
আমি উত্তর দিলাম, আঠারো।
ভাইয়া মুচকি হেসে বললেন, না তোমার বয়স সাড়ে ষোলো। আমার বয়স জানো?
-হুম জানি, সাতাশ/ আঠাশ
-হয়নি। তেত্রিশ।

শোনো তুমি যে বয়সে আছো সেই বয়সে আমি একটা মেয়েকে প্রচন্ড ভালোবাসতাম মনে হত এই মেয়েকে না পেলে আমি মারা যাব। ভার্সিটতে উঠার পর খেয়াল করলাম তার কথা আমার বিশেষ মনে পড়ছে না।

তোমার বয়সটাই এমন তোমার ক্লাসের কম বয়সী স্যারের প্রেমে তুমি পড়বে, ক্লাসের যে ছেলেটা চমৎকার গান গায়
তুমি তার প্রেমেও পড়বে আবার এমন কিছু প্রেম আসতে পারে যা একেবারে অসম, অসম্ভব এবং বিপজ্জনক।

আমি তোমার ব্যাপারটা ধর‍তে পেরেছি। তুমি মাঝে মাঝে আমার রুমে ইচ্ছে করে ওড়না ছাড়াই আসো । আমার দু চোখ বন্ধ থাকে না কিন্তু কামনার দৃষ্টি অবশ্যই বন্ধ থাকে। আমার বোন মীরার সাথে আমি তোমার পার্থক্য কখনও করিনি।

তোমার আপুর অনেক কিছুর সাথেই আমার অমিল আছে। ওর বৃষ্টি পছন্দ না,মুভি পছন্দ না, খিচুড়ি ভালো লাগে না আরও অসংখ্য অমিল আছে কিন্তু দিনশেষে আমি ওকে অসম্ভব ভালোবাসি এবং তোমার আপুও । তোমার প্রতি আমার অন্য ধরনের আকর্ষণ থাকলে আমি তোমার আপুকে বিয়ে করতাম না।

সৌন্দর্যের দিক থেকে অবশ্যই তুমি এগিয়ে কিন্তু আমি শুধু সৌন্দর্য চাইনি প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তা, উচ্চশিক্ষিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নারীকে চেয়েছি। সাবিহা আমার মনে হয় তোমার ক্লাস করা খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে এখানে থেকে। আমি আমার মাকে আসতে বলেছি।

আমি কাঁপা গলায় বললাম, আপনি কি ইনডিরেক্টলি আমাকে চলে যেতে বলছেন?
তুমি যা মনে কর তবে আমার মনে হয় তুমি যতদিন ভালোবাসা এবং মোহের মাঝে পার্থক্য না বোঝ ততদিন আমার সাথে তোমার দূরত্বে থাকা উচিত। একটা কথা মনে রেখো, ভালোবেসে প্রদীপের সলতে হও যাতে তুমি যতক্ষণ থাকো ততক্ষণ যেন আলোকিত হয়ে থাকে। ভালোবেসে মোম হয়ো না। গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
আমি তোমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসব।

আমি অভিমানী কণ্ঠে বললাম, তার দরকার নেই। আমি একাই যেতে পারব। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলাম। আমার চোখ জলে ভরে গেল। সেই জল কষ্টের, অভিমানের নাকি লজ্জার বোঝা গেল না।

এরপর মেঘে মেঘে অনেক বেলা। আমি আর কখনও আপুর বাসায় যাইনি। এইচ.এস.সি পাশের পর এম.বি.বি.এস পড়তে চীন চলে এলাম। এখানেই পড়ালেখার ইতি ঘটলো। একজন চমৎকার মানুষের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি এক সন্তানের জননী।

বহু বছর পর দেশে ফিরেছি। আপু আর দুলাভাই দাওয়াত করেছেন তাদের বাসায়। আমি আর অনিক গেলাম। গল্প, আড্ডা হলো বেশ। সন্ধ্যা বেলায় ছাদে গিয়ে দেখি মুনতাসির ভাই গাছে পানি দিচ্ছেন। আমাকে দেখেই বললাম, দেখো কী চমৎকার ফুল ফুটেছে! কথার এক ফাঁকে আমি বলেই ফেললাম, আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন তো?

মুনতাসির ভাইয়া হাসতে হাসতে বললেন, তুমি দেখি এখনও ওসব মনে রেখেছো?

আমি কিন্তু এখন মোহ এবং ভালোবাসার পার্থক্য বুঝেছি। সম্ভবত অনিকের ঘরের প্রদীপের সলতে হতে পেরেছি।
আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ সেদিন আমাকে ফিরিয়ে না দিলে আজীবন আমি অনুশোচনার আগুনে জ্বলে যেতাম। আজ এত সুন্দর জীবন আমি পেতাম না।

মুনতাসির ভাই মৃদু গলায় বললেন, আমরা মানুষ বলেই ভুল করি তবে আজীবন ভুলের মধ্যে থাকাটা অন্যায়।
আমার চোখে জলে ভরে গেল তবে অভিমান কিংবা লজ্জায় নয় বরং এই মানুষটার প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধায়।

আমি বিড়বিড় করলাম,” ভালোবেসে প্রদীপের সলতে হও যাতে যতক্ষণ তুমি থাকো ততক্ষণ যেন আলোকিত হয়ে থাকে। ভালোবেসে মোম হয়ো না। গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে”।

লেখক:প্রাক্তন শিক্ষার্থী -উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন