১৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
যার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা হুট করে সে আমাদের বাসায় এসে হাজির। কী এক লজ্জার ব্যাপার! হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে অহেতুক।
নেভী ব্লু রঙের শার্ট পরা পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি উচ্চতার যে তরুণ একগুচ্ছ লাল গোলাপ হাতে বসে আছে সেই ভদ্রলোকের নাম সীমান্ত ইমতিয়াজ । ফ্যানের বাতাসে তরুণের ঝলমলে চুল উড়ছে,সূচালো নাকের ডগায় শিশিরকণার মত বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। চিবুকের কুচকুচে কালো তিল তার সৌন্দর্য বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়ে দিয়েছে।
…
এই তরুণের সাথে সপ্তাহখানেক বাদেই রজনীর বিয়ে। রজনী খানিকটা ভীত হরিণীর মত চুপচাপ বসে আছে। ডাগর চোখের এই তরুণী কবে কখন অতি নিভৃতে প্রণয়তীরে এফোঁড় ওফোঁড় করে হৃদয় বিদ্ধ করেছে সেই হিসেব সীমান্ত রাখেনি। পদ্মফুলের মত দুটো কোমল হাত ছুঁয়ে সীমান্তের বলতে ইচ্ছে করছে ” এত মায়াবতী হয়ে জন্ম নেয়াটা অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে। পুড়ে ভস্ম হয়ে যাচ্ছি। ” শেষ পর্যন্ত সীমান্ত শুধু ফ্যাসফ্যাসে গলায় এইটুকু বলতে পারলো ” ফুলগুলো তোমার জন্য”।
রজনী মুচকি হেসে গোলাপগুলো নিল।
….
নরম রোদে ভীষণ মায়াবী দেখাচ্ছে চারপাশ। সীমান্ত আর রজনী পাশাপাশি হাঁটছে। রজনীর মা নিজে থেকেই ওদের বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বললেন। চনমনে রোদ আর নেই। রাইঘাসগুলো চকচকে দেখাচ্ছে। সীমান্ত হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বলল,’ জীবনানন্দের কবিতার দুটো লাইন মনে পড়ছে ভীষণ, শোনাব?’ রজনী মাথা নেড়ে বলল ‘ অবশ্যই’। সীমান্ত মৃদু গলায় আবৃত্তি করলো , ‘ সন্ধ্যা হয় চারিদিকে শান্ত নীরবতা; পৃথিবীর সব রূপ নেমে আসে ঘাসে। ‘ , ‘জানো তো রজনী, আমার মনে হয় কবিতাটা জীবনানন্দ এভাবে লিখতে চেয়েছিলেন– সন্ধ্যা হয় চারিদিকে শান্ত নীরবতা ; পৃথিবীর সব রূপ নেমে আসে প্রেয়সী যখন হাসে।’ রজনী সত্যিই ফিক করে হেসে ফেলল । তারপর চোখ সরু সরু করে বলে ফেলল , ‘ আপনার বানানো লাইনটা অত্যন্ত উদ্ভট হয়েছে।’
…
দেবদারু গাছে দুটো ঘুঘু ঘাড় ফুলিয়ে ডাকছে। মর্মর করে ভাঙছে পলাশের ডাল। ধুলো উড়িয়ে নিচ্ছে বাউকুমটা বাতাস। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো হঠাৎ । টালমাটাল চোখে নিখাদ প্রেমের দৃষ্টি মেলে বৃষ্টিস্নাত প্রেয়সীর হাত ধরে সীমান্ত বলে ফেলল ” ভালোবাসি”।
…
মুক্তোর মত টপটপ করে রজনীর চোখে জলের ফোয়ারা। লাল রঙের বেনারসি, চোখে কাজল, হাতে মেহেদীর কারুকাজ। রজনী বসে আছে চুপচাপ। সীমান্ত এলো কিছুক্ষণ বাদেই। আজ তাদের ফুলশয্যা। সীমান্ত জানালা খুলে দিয়ে বলল ” দেখো জোছনা কেমন আলো আঁধারি খেলা খেলছে যেন অসংখ্য জোছনার ফুলে চারদিক ছেঁয়ে গেছে। সীমান্ত হাত ধরে রজনীকে জানালার কাছে নিয়ে এলো আলতো করে মুছে দিল চোখের জল। তারপর রজনীর কানে ফিসফিস করে বলল ”
“ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়
তেমন করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়ে
দুঃসময়ে এতটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন
কেউ ডাকেনি তবু এলাম,বলতে এলাম ভালোবাসি। ”
রজনী হুট করে সীমান্তকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল ” ভালোবাসি “।
..
বিয়ের তিনদিন পরই ওরা হানিমুনে গেল দার্জিলিং। কী কনকনে ঠান্ডা!
প্রথমে ‘ জেট এয়ার’ বিমানে গেল কলকাতা তারপর ‘ এয়ার ইন্ডিয়া ‘ বিমানে শিলিগুড়ি। পুরোটা সময় ওরা রইলো মেঘের কাছাকাছি। তুলোর মত মেঘ রজনীর ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল খুব৷ শিলিগুড়ি নেমে চান্দের গাড়িতে পৌঁছে গেল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুট উপরে অবস্থিত নৈসর্গিক দার্জিলিং। ঘুরে ঘুরে দেখলো ম্যাল, জাপানিজ ট্যাম্পল, চা বাগান, টাইগার হিল। কখনও কখনও রজনী আচমকা সীমান্তের হাত ছুঁয়ে বলল ” ওমা তোমার হাত তো জমে বরফ হয়ে গেছে!”
…
প্রকৃতির নিয়মে সময়ের কাঁটা ঘুরতে থাকে। চৌচির হয়ে ফেটে যাওয়া মাটিতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির পরশ লাগে। জারুলের ফুলে ছেয়ে থাকে পুকুরের পাড়। মুগ্ধ চোখে রজনী তাকিয়ে দেখে হলদে পাখির নাচন। এক সময় হলদে পাখি ফুড়ুৎ করে কোথায় যেন উড়ে যায়৷ ঋতুর পালাবদলে পত্রঝরার সময় আসে। শুভ্র শিশিরে ছেয়ে থাকে ঘাসের ডগা।
…
রজনী ফোনটা হাতে নিয়ে সীমান্তকে ম্যাসেজ দিল ” সীমান্ত তুমি কোথায়? এক্ষুনি বাসায় এসো। একটা গুড নিউজ আছে। তুমি বাবা হবে। ”
সীমান্ত বাসায় এলো এক ঘণ্টার মধ্যেই। রজনী তখন গুটিসুটি হয়ে ঘুমুচ্ছে। ডান হাত ভাজ করে মাথার নিচে রাখা, মিশমিশে কালো চুল ছড়িয়ে আছে অনেকটা। ফর্সা পায়ে রূপার নুপূর আজ যেন সৌন্দর্য বাড়াবাড়ি রকম বাড়িয়ে দিয়েছে। সীমান্ত আলতো করে চুমু দিল রজনীর কপালে। কিছুক্ষণ পরই সীমান্ত টের পেল রজনী ঘুমায়নি,ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে। সীমান্ত আদুরে গলায় বলল, ” অনেক ঢঙ হয়েছো এবার উঠো”
….
রজনী খিলখিল করে হেসে উঠলো। সীমান্ত রজনীর পদ্ম ফুলের মত দুটো কোমল হাত ধরে টেনে তুলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। রজনী সীমান্তে ডান হাত টেনে নিয়ে ওর পেটের উপর রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। সীমান্ত রজনীর চিবুক ছুঁয়ে বলল,” কাঁদছো কেন রজনী?”
রজনীর মুক্তোর দানার মত চোখের জল দেখতে ভালো লাগছে। কিছু কান্নার নিগূঢ় অর্থের মর্মার্থ বোঝার সাধ্য নেই।
…..
সীমান্ত একগাদা খেলনা কিনে এনেছে সাথে নাদুস নুদুস কয়েকটা বাচ্চার ছবি। একটা বাচ্চা আবার আয়েশ করে ফিডার খাচ্ছে। খুব শীঘ্রই এই ছবির মত একটা ছোট্ট পুতুল সারা ঘর দৌড়ে বেড়াবে৷ কবে আসবে সেদিন?
..
রাত প্রায় আড়াইটা বাজে। সীমান্ত অভ্যাসবশত ডান হাত বাড়িয়ে দিতে গিয়েই টের পেল পাশে রজনী নেই। রজনী জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে। সীমান্ত উঠে গিয়ে রজনীর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো ” শরীর খারাপ লাগছে রজনী?”
রজনী থমথমে গলায় বলল,’ তোমার সাথে কিছু কথা আছে সীমান্ত। ছাদে চলো। ‘
..
সীমান্ত একরাশ আতঙ্ক নিয়ে রজনীর পিছু পিছু ছাদে গেল। সীমান্ত ফ্যাকাসে মুখে জিজ্ঞেস করলো ‘ রজনী কী হয়েছে বলো তো?’
রজনী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘ প্রকৃতিতে যখন ঝড় আসে তখন খুব শান্ত স্থির হয় তারপর সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। এখন যা বলব তা শোনার পর তোমার কেমন লাগবে জানি না তবে বলাটা প্রয়োজন। ‘
–কী কথা রজনী?
রজনী দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘এই বেবিটা তোমার নয় সীমান্ত। বেবিটা প্রতীকের। ‘
…
সীমান্ত অপলক দৃষ্টিতে পাথরের মূর্তির মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সমস্ত অনুভূতি মাছের কাঁটার মত গলায় আটকে আছে যেন। রজনী অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে বলা শুরু করলো,’ একবার ভেবেছিলাম তোমায় কিছু জানাবো না। পরক্ষণেই ভাবলাম লুকিয়ে রেখে লাভ কী? কিছুদিন পর আমি আর প্রতীক বিয়ে করব৷ ‘
সীমান্ত কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো ‘ এসব তুমি কী বলো রজনী?’
— যা বলেছি তা তুমি শুনেছো। সত্যি করে বলো তো তুমি জানতে না প্রতীকের সাথে আমার রিলেশন?
— হুম জানতাম
— জেনেশুনেও আমাকে বিয়ে করলে কেন? তুমি কি ভেবেছিলে এক্সপেনসিভ শাড়ি, গয়না পেয়ে আমি সব ভুলে যাব? তোমাকে ভালোবাসবো? ভালোবাসা এত সস্তা?
…..
সীমান্ত চোখ বন্ধ করে উত্তর দিল ” অনুভূতির দুয়ার যেখানে বন্ধ ভালোবাসা সেখানে কড়াঘাত করার আগেই তার দিক পরিবর্তন করে সেটাই নিয়ম৷ আমার প্রতি তোমার অনুভূতিও হয়তো এমন শূন্যের কোটায় চলে গেছে।
— আচ্ছা তুমিই বলো অতীত আর বর্তমান দুটোকে কখনও সমান করে ভালোবাসা যায় সীমান্ত?
— অতীত আর বর্তমান দুটো ভালোবাসার ধরন আলাদা হলেও কখনও কখনও তার তীব্রতা একই।
রজনী প্রতিবাদ করলো ‘ একটার তীব্রতা মনে হয় বেশিই’
–বেশি তীব্রতার ভালোবাসাটুকু বর্তমানের জন্য বরাদ্দ থাকতে পারে না রজনী?
— তুমি তো এখন আমাকে রীতিমতো জোর করছো। জোর করে আমি তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আর যে স্ত্রী তার প্রেমিকের সন্তানের মা হতে যাচ্ছে তার মত দুশ্চরিত্রাকে নিয়ে সংসার করার প্রয়োজন কী?
….
সীমান্ত আনমনে মৃদু স্বরে বললো ” হৃদয়ের মূল্যবান জায়গাটা কোনো এক অজানা কারণে সেই পেয়ে যায় যার কাছে আমাদের মূল্য ছুঁড়ে দেয়া ছেঁড়া কাগজের চেয়েও বেশি সস্তা। ভালোবেসে মোম হতে নেই গলে নিঃশেষ হওয়াটাই হবে তার শেষ পরিণতি। তুমি আমাকে নিঃশেষ করে দিলে রজনী। ‘
…..
রজনী চোয়াল শক্ত করে বলল ‘ আমি চাই আমাদের ভিভোর্স খুব শীঘ্রই হয়ে যাক। আগামীকালই আমি বাবার বাসায় যাব। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আশা করি এই সন্তানের ব্যাপারে আমার মা বাবাকে কিছুই জানাবে না এই বিশ্বাসটুকু আমি তো রাখতেই পারি। ‘ রজনী গটগট করে রুমে চলে গেল কেবল সীমান্তই স্থাণুর মত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
….
পরদিন সকালেই সীমান্ত আর রজনী রওনা হল। রজনী আজ থেকে ওর বাবার বাসায় থাকবে। হয়ত আর কোনোদিন ভুলেও রজনীর মনে হবে না সীমান্ত নামের কেউ একজন ওর জীবনে ছিল। দুপুরের তপ্ত রোদে পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকালে কেমন মরীচিকার মত লাগে আর নিজের দিকে তাকালে শত স্বপ্নের মরীচিকারা ভীড় জমায়।
…
বিকেল চারটায় ওরা রজনীর বাবার বাসায় পৌঁছালো। রজনীর মা রওশন আরা এবং বাবা প্রফেসর মামুন -উর রশীদ সীমান্তকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসে। তাদের মেয়েকে সে রানীর মত রেখেছে।
…
সীমান্ত এবং রজনীর বাবা চা – বিস্কুট খেতে খেতে গল্প করছে৷ রজনী ঘুমুচ্ছে। সীমান্তের মনমরা মুখ রজনীর বাবার দৃষ্টি এড়ালো না। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ কী ব্যাপার সীমান্ত তোমার কী শরীর খারাপ?’
সীমান্ত বুঝে গেল প্রফেসর সাহেবের বিচক্ষণ দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব না। সীমান্ত মৃদু স্বরে বলল ‘ রজনী আমার সাথে থাকতে চাচ্ছে না বাবা। ও ডিভোর্স চাচ্ছে। ‘
রজনীর বাবা থমথমে মুখে বসে রইল কিছুক্ষণ তারপর কঠিন গলায় বলল ‘ সব সর্বনাশের মূল ঐ প্রতীক। ও আমার মেয়ের মাথা খেয়ে ফেলেছে। ‘
…
সীমান্ত আর কিছু বলল না। রজনীর রুমে গিয়ে দেখলো ও ঘুমুচ্ছে এখনও। চাঁদের আলো পড়েছে ওর স্নিগ্ধ মুখে। একগুচ্ছ অবাধ্য চুলের কপাল বরাবর আনাগোনা। সীমান্তের ইচ্ছে করছিল চুলগুলো সরিয়ে দিতে।’ না থাক ঘুম ভেঙে যাবে ‘ এই ভেবে আর কাছে গেল না।
…
রজনী ঘুমের মধ্যে মিটিমিটি হাসছে। হয়ত স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে কাকে দেখছে? প্রতীককে?
সীমান্ত কি প্রতীককে হিংসে করে? একজন মৃত মানুষকে হিংসে করা যায়? হ্যাঁ অবশ্যই যায়। দুই বছর আগে বাইক অ্যাকসিডেন্টে মরে যাওয়া সেই অনস্তিত্বের মানুষটা যদি তার প্রিয়তমা স্ত্রীর সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে বসে থাকে তবে তাকে হিংসে করা যায়। সেই মৃত প্রতীককে বানিয়ে দিচ্ছে তার কল্পিত সন্তানের পিতা।
….
শুরুর দিকে প্রেগন্যান্সির বিষয়টা সীমান্ত বিশ্বাস করলেও ক্রমশ ওর সন্দেহ হয়। এরপর সীমান্তের সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু দীপ্ত সীমান্তকে জানিয়ে দেয় পুরোটাই ওর অবচেতন মনের কল্পনা। সচরাচর সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে যা হয় আর কী!
…
সীমান্ত জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। ওর চোখ ভরে জলে আসে। জীবনটা এমন কেন হল?
সীমান্তের খুব ইচ্ছে ছিল ওদের মেয়ের নাম রাখবে ” শুকতারা”।
সেই শুকতারার নাক, চোখ হবে সীমান্তের মত। রজনী নিশ্চয়ই কপট রাগ করার অভিনয় করে বলবে ” মেয়েটা দেখতে আমার মত না হয়ে হুবহু তোমার মত হলো কেন? ‘
সীমান্ত তখন খিলখিল করে হাসবে।
যে মুখে সীমান্তের মা কঠিন গলায় বলেছিল ‘ দুনিয়ায় কি মেয়ের অভাব? বেছে বেছে পাগল মেয়েকে বিয়ে করতে হলো কেন? ‘ একদিন হয়ত মায়ের রাগ ভাঙবে। রজনী হয়ত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।
…
সীমান্তের একই ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ছিল প্রতীক আর রজনী। প্রতীকের সাথে রজনীর প্রেমের বিষয়টি অজানা ছিল না ওর। রজনীকে আগে থেকে ভালোবাসলেও কখনও জানতে দেয়নি। অন্য কারো কাছে প্রিয়জন যদি ভালো থাকে তবে মন্দ কী? হুট করে একদিন জানা গেল প্রতীক অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। তারপর থেকেই রজনী ভারসাম্যহীন। সবকিছু জেনেশুনেও সীমান্ত ওকে বিয়ে করেছে।
….
প্রফেসর মামুন উর রশীদ বারান্দায় বসে আছেন। তার হাতে ধোঁয়া উঠা চা। মামুন সাহেবের পাশের চেয়ারে প্রতীক বসে আছে। মামুন সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে প্রতীকের দিকে তাকিয়ে বললেন ‘ তুমি কেন বারবার আসো প্রতীক? চলে যাও এখান থেকে। প্রতীক মুচকি হাসলো। মায়াভরা হাসি। ধীরে ধীরে বলল, ‘ ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে খুব কষ্ট পেয়ে মরেছি স্যার ‘।
মামুন সাহেব বিড়বিড় করে বললেন ‘ মরণ তো কষ্টেরই। কোন মরণ আবার সুখের?’
…
প্রতীক বাঁকা হাসি দিয়ে চলে যায়। আজকাল প্রায়ই মামুন সাহেবের হ্যালুসিনেসন হচ্ছে। মরে গিয়েও ছেলেটা স্বস্তি দিচ্ছে না। ছাত্র হিসেবেও মামুন সাহেব ওকে মাত্রাতিরিক্ত অপছন্দ করতেন। ক্লাসেও এটা সেটা বলে অপমান করতেন। এর কারণ ছিল প্রফেসর সাহেবের মেয়ের সাথে প্রেম। আর যাই হোক এমন একটা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেকে মেয়ের জামাই বানাতে সে নারাজ।
….
প্রতীক মারা যাওয়ার পর মামুন সাহেব স্বস্তি পেয়েছিলেন কিন্তু ভয়াবহ ব্যাপার হল তার মেয়েটা স্বাভাবিক নেই। জগতটা এমনই প্রকৃতি সবই ফেরত দেয় কড়ায় গন্ডায়।
….
পরিশিষ্ট : হেলমেট বিহীন ঝলমলে চুলের এক তরুণ খোলা রাস্তায় বাইক চালাচ্ছে। বেশ রাত তখন। চারদিকে সুনসান নীরবতা। বাইকের পেছনেই সাঁ সাঁ করে ট্রাক আসছে। কিছুক্ষণ আগেই ট্রাকের ড্রাইভারকে ওপাশ থেকে ফোনে একজন জানিয়ে দিয়েছে ‘ বজলু মিয়া কুত্তার বাচ্চাটাকে এমনভাবে পিষে দাও লাশ যেন কোনোভাবেই শনাক্ত করা না যায়। আমার মেয়ের সাথে প্রেম করার খায়েস মেটাব। ‘ শেষ পর্যন্ত লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। রক্তাক্ত তরুণের ওয়ালেটে আইডি কার্ড পাওয়া গেল। জ্বলজ্বলে অক্ষরে সেখানে লেখা ছিল ‘ প্রতীক আহসান। ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস,ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা। ‘
লেখক:তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া,শিক্ষার্থী,উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।