14 August 2026, 12:03 PM
আছমা জান্নাত মনি,বিশেষ প্রতিনিধি ,যুক্তরাজ্য
সিলেটের সকাল এখনও সবুজ, বাতাসে এখনও চায়ের ঘ্রাণ, সুরমার তীরে এখনও মানুষের আনাগোনা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে জমে থাকা কিছু প্রশ্ন কি আমরা শুনতে পাচ্ছি?
মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে সিলেট মহানগরে ২৪টি হত্যা, ৪৪টি ধর্ষণ, ১৮৪টি চুরি, ৮টি ডাকাতি এবং ৫৪টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। সংখ্যাগুলোকে শুধু হিসাব হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি ভয়, একটি ক্ষতি এবং কখনো একটি সারাজীবনের ক্ষত।
তবে প্রশ্ন শুধু অপরাধ কত হলো—তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এমন পরিবেশ তৈরি হতে দিলাম?
একটি সমাজে অপরাধ হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। পরিবারে অবহেলা, মাদকের বিস্তার, তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সামাজিক মূল্যবোধের দুর্বলতা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষের নীরবতা—সবকিছু মিলেই ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়।
তাই সমাধানও হতে হবে বহুমুখী।
পুলিশকে আরও কার্যকর হতে হবে, কিন্তু পুলিশের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। পরিবারকে সন্তানদের সময় দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজকে তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে আমাদের তরুণদের নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। তাদের হাতে যদি দক্ষতা, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ থাকে, তাহলে হতাশা ও অপরাধের জায়গা সংকুচিত হবে। সিলেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে শিল্প, ব্যবসা, পর্যটন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সিলেটের উন্নয়নের প্রশ্নটিও তাই নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকে আলাদা নয়।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের ধীরগতি, রেল যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, জলাবদ্ধতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত শিল্প ও কর্মসংস্থানের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। অথচ এই অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ, পর্যটন এবং প্রবাসী অর্থনীতির কারণে সম্ভাবনাময়।
এই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার হলে সিলেটের তরুণদের জন্য নিজের শহরেই নতুন ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে।
আমাদের তাই শুধু অভিযোগ করলে হবে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক দাবি, শান্তিপূর্ণ নাগরিক উদ্যোগ এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নয়। কারণ একটি সভ্য সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথও হতে হবে ন্যায়সংগত।
আমরা এমন সিলেট চাই, যেখানে রাত নামলে মানুষের মনে ভয় নয়, নিশ্চিন্ততা তৈরি হবে। যেখানে তরুণদের সামনে অপরাধের নয়, সম্ভাবনার দরজা খুলবে। যেখানে উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান এবং তার সুফল পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের কাছে।
সিলেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
নীরব থাকলে সমস্যাগুলো নিজে থেকে চলে যাবে না। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে পরিস্থিতি বদলাতে।