২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
অধ্যাপক ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত গত দুই দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও গুণগত মান, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬৫টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়-এর মধ্যে ৫০টির বেশি সরকারি ও ১১০টির বেশি বেসরকারি-এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৪৮-৫০ লক্ষ। প্রতিবছর প্রায় ১০-১২ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের চেষ্টা করে, কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এতে প্রবেশাধিকার বেড়েছে, কিন্তু মাননিয়ন্ত্রণ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত অনেক প্রতিষ্ঠানে ১:৩০ থেকে ১:৪০-যা উন্নত বিশ্বের মানদণ্ড (১:১৫-১:২০) থেকে অনেক বেশি। গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বাংলাদেশের ব্যয় জিডিপির ০.৩%-এরও কম; তুলনায় ভারত প্রায় ০.৭% এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৪%-এর বেশি ব্যয় করে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা ও পেটেন্টের সংখ্যায় অগ্রগতি থাকলেও তা এখনও সীমিত। বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সাধারণত ৮০০-১০০০ এর পরিসরে, যা গবেষণা অবকাঠামো, তহবিল ও আন্তর্জাতিকীকরণের
ঘাটতিকে নির্দেশ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত বেকারত্বের উদ্বেগ। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪-৫% হলেও স্নাতক তরুণদের মধ্যে তা ১০-১২% বা তার বেশি। নিয়োগকর্তারা প্রায়ই সফট স্কিল, ইংরেজি দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত পারদর্শিতার ঘাটতির কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের দুর্বল সংযোগ এই ব্যবধানকে বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট, রাজনৈতিক প্রভাব ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে শিক্ষা খাতের গুণগত উন্নয়ন, সুশাসন ও দক্ষতা-কেন্দ্রিক মানবসম্পদ গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিতে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার সম্প্রসারণ, এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত পাঠ্যক্রম প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প অংশীদারিত্ব জোরদার এবং উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে সমর্থনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদি গবেষণায় বিনিয়োগ জিডিপির অন্তত ১% পর্যন্ত বাড়ানো যায় এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক অনুদান চালু হয়, তবে প্রকাশনা, পেটেন্ট ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তবে কেবল নীতিপত্রে প্রতিশ্রুতি নয়-কার্যকর বাস্তবায়নই মূল চাবিকাঠি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য স্বশাসন ও জবাবদিহি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে; নিয়মিত একাডেমিক অডিট, শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও কো-অপ প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে মাননিয়ন্ত্রণ জোরদার, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে প্রণোদনা দরকার। কর্মসংস্থানমুখী কোর্স-ডাটা সায়েন্স, এআই, সাইবার সিকিউরিটি, গ্রিন টেকনোলজি-বিস্তৃত করা গেলে বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ মজবুত হবে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে-জনসংখ্যার প্রায় ৬০-৬৫% কর্মক্ষম বয়সী। আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে দেশের তরুণরা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছে; লক্ষাধিক ফ্রিল্যান্সার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছে। “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১” ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাই-টেক পার্ক, ইনোভেশন হাব ও বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক স্টার্টআপ সাপোর্ট সিস্টেম শক্তিশালী করা গেলে উচ্চশিক্ষা সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারবে।
সারকথা, উচ্চশিক্ষার সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই; তবে সম্ভাবনাও বিপুল। ৩১ দফার ঘোষিত লক্ষ্য-গুণগত মান, সুশাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন-যদি সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট ও স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান নিতে পারে। নীতি ও বাস্তবায়নের এই সেতুবন্ধনই নির্ধারণ করবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী প্রজন্মকে কতটা সক্ষম, উদ্ভাবনী ও বিশ্বমানের নাগরিকে রূপান্তর করতে পারবে।
অধ্যাপক ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়