শুক্রবার, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২০ আগস্ট ২০২৫, ৫:০০ অপরাহ্ণ

সিলেটে পাথর লুটপাট: বলির পাঁঠা ডিসি মুরাদ

আপডেট টাইম : আগস্ট ২০, ২০২৫ ৫:০০ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ, জাফলং ও গোয়াইনঘাটের ইসিএভুক্ত এলাকায় অবাধে সাদা পাথর লুটপাট শুরু হয়। এ বিষয়ে দৈনিক আলোকিত সিলেটে ছবি ও তথ্য প্রমাণসহ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রশাসনকে বারবার সতর্ক করার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে উঠে আসে, পাথর লুটপাটের নেপথ্যে রয়েছে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট চক্রের আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী নেতাদের পিছনে রেখে সামনের সারিতে বিএনপির একটি বড় অংশ ও জামায়াতে ইসলামীর কতিপয় নেতা কাজ করছিলেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ফ্যাসিবাদী শাসনের মতো পাথর ও বালু উত্তোলন শুরু হয়। পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসন কেবল দায়সারা ও লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করে।

অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জৈন্তা, গোয়াইনঘাট,কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের সাধারণ মানুষ বারবার প্রতিবাদ জানালেও রাজনৈতিক নেতারা তা আমলে নেননি এবং প্রশাসনও সঠিক সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ সর্বদলীয় একটি ঐক্যের রুপরেখা তৈরি হয়। যাদের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পাথর উত্তোলন হয়েছিল, তারাই ৫ই আগস্টের পর এই কার্যক্রম চালায়।

কোম্পানীগঞ্জের এক ভদ্রলোক, যাকে পরবর্তীতে বিএনপি বহিষ্কার করে, তার অবৈধ পাথর উত্তোলনের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তিনি পত্রিকার সাংবাদিকদের একাধিকবার হুমকি দিয়েছিলেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে জনগণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে পাথর কোয়ারি ও সনাতন পদ্ধতিতে উত্তোলনের দাবি তোলে। এই দাবিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক নেতারা আন্দোলনে নামেন।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কর্মী ছিল এমন কতিপয় অসাধু শ্রমিক নেতাকে নিয়ে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সমাবেশ করা হয়, যেখানে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে উশৃংখলভাবে শ্রমিকরা রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি দেয় এবং পাথর-বালু কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবি জানায়। তাদের মূল উদ্দেশ্য পরিবেশবান্ধব উত্তোলন নয়, বরং লুটপাট ছিল।

জাফলং ও ভোলাগঞ্জের অবস্থা খারাপ হতে থাকলে পরিবেশ উপদেষ্টা ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা এলাকা পরিদর্শনে এলে জাফলংয়ে লুটপাটকারীরা তাদের গাড়ি আটকে দেয়; এই লুটপাটকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণে উপদেষ্টাদ্বয় ভোলাগঞ্জে যাননি। তারা জাফলংয়ের করুণ অবস্থা দেখে জেলা প্রশাসককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাপ দেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ তখন অবৈধ ক্রাশার মেশিন তুলে দেন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।পাথরবাহী গাড়ী জব্দ করতে থাকেন। কিন্তু এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর একদল নেতা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিক সমাবেশের ডাক দেন, কর্মবিরতির আহ্বান জানান এবং জেলা প্রশাসকের অপসারণ দাবি করেন।তার এ ধরনের অনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদ।

উদ্বুত পরিস্থিতিতে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে পরিবহন শ্রমিক নেতা ও রাজনৈতিক নেতাদের একটি বৈঠকে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, দেশের অন্য সব এলাকায় পাথর উত্তোলন হলে সিলেটে কেন হবে না। এই বক্তব্যকে লুটপাটকারীরা তাদের মহোৎসব চালানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, যার পরিণতিতে সাদা পাথর হত্যাকাণ্ড ঘটে। এই সম্পূর্ণ ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের গাফিলতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত বলির পাঁঠা হয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ।সাদাপাথর লুটপাট কান্ডে আইন শৃঙ্খলা অবনতির জন্য প্রশাসনের স্থানীয় ও উচ্চ পর্যায়ের কর্তাবৃন্দ এবং পুলিশের চরম গাফিলতির পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের চাপকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

পরবর্তীতে সাদাপাথরে পাথরলুটের ঘটনায় জেলা প্রশাসক কঠোর কর্মসূচি নিলেও সরকার তাকে প্রত্যাহার করে নেয়।আজ সোমবার ডিসি মুরাদ সিলেট ছাড়ছেন এক বুক ব্যথা নিয়ে।

উল্লেখ্য,চব্বিশের ছাত্র গণ অভ্যুত্থানের পর এক কঠিন সময়ে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। অত্যন্ত স্বল্পভাষী,সজ্জন ও নম্র প্রকৃতির সরকারি এই আমলা নীতির ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপোষহীন।

ডিসি মুরাদের সহজ সরল বাচনভঙ্গি, স্বাভাবিক চলাফেরা, বিনয় স্বভাব ও কোমলতাকে দেখে কেউ কেউ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা সুযোগ দেননি।অন্যায় ও অসাধুতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বড় বাঁধা। রাঘব বোয়ালদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তদবিরকে পাত্তা না দেয়াই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষা জীবন ও কর্মজীবনে মা ছাড়া কখনো তিনি ঈদ করেননি।সিলেটে এসে জনগণের স্বার্থে দুটি ঈদ মা ছাড়াই তিনি করলেন।

মাতৃভক্তিবোধ সম্পন্ন সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে।পাথরকান্ডে সমালোচিত হলেেও তিনি অনেক বীরত্বপূর্ণ ও মানবিক কাজও করে গেছেন সিলেটে।তাঁর প্রস্থান বিষাদের হলেও বীরোচিত।

শেয়ার করুন