৯ আগস্ট ২০২৫, ৭:৫১ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের সভাপতি মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, এডব্লিউসি, এএফডাব্লিউসি, পিএসসি, জি,বলেছেন উশু শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি জীবনচর্চা। তিনি উল্লেখ করেন উশু চর্চা শুধু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বা আত্মরক্ষার কৌশল রপ্তেই সহায়তা করে না, বরং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃতির যথাযথ সমাদর নিশ্চিতকল্পে জনসচেতনতা বৃদ্ধিও উশুর অন্যতম মূলমন্ত্র। এরই আলোকে এ বছরের উশু-কুংফু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘Celebrate Taiji Together’ বা ‘সম্মিলিতভাবে তাই-চি উদযাপন’। তিনি শনিবার (০৯ আগস্ট) সিলেট নগরীর উপশহরে বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের আয়োজনে উৎসবমুখরভাবে বিশ্ব উশু দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয় যা বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে শুরু হয়ে সুবহানিঘাট কাঁচা বাজার হয়ে উপশহর স্পোর্টস কমপ্লেক্সে শেষ হয়। পরবর্তীতে একটি প্রদর্শনী উশু ম্যাচ আয়োজন করা হয় এবং এবছরের জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় সিলেট বিভাগে ভালো ফলাফল অর্জনকারী উশু খেলোয়াড়দের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। মূলত এই দিনটি চীনা মার্শাল আর্ট ‘উশু’-এর চর্চা ও বিশ্বব্যাপী প্রসারের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। এই দিনটি পালনের মাধ্যমে সকলকে উশু শিখতে, উপভোগ করতে এবং তাদের জীবনের অংশ হিসেবে এটি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো: রেজাউল করিম পিপিএম সেবা, সেনাবাহিনীর ৩৪ বীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদ, এসএমপির ডিসি(নর্থ) সজীব খান, সিলেটের পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম, বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট এর প্রতিনিধি সিনিয়র সহকারী কমিশনার উম্মে সালিক রুমাইয়া, সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ড. এনামুল হক চৌধুরী, ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ, মো. শাহজাহান আলী, মোকাম্মেল হক, সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, আহমদ ওমায়ের, সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ইকরামুল কবির, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব সভাপতি গোলজার আহমদ হেলাল, ইমজা সেক্রেটারি সাকিব আহমদ মিঠু, জেলা ক্রীড়া অফিসার নুর হোসেন, ফেডারেশনের কর্মকর্তাবৃন্দ, সিলেট বিভাগের সকল উশু খেলোয়াড় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের কর্মীবৃন্দ।
প্রধান অতিথি মেজর জেনারেল রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ০৯ আগস্ট ২০২৫ আন্তর্জাতিক উশু ফেডারেশনের নির্দেশনায় বিশ্বব্যাপী ‘৮ম উশু-কুংফু দিবস’ পালিত হচ্ছে এবং এই উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের সমগ্র উশু, কুংফু ও অন্যান্য ঐতিহ্যগত চাইনিজ মার্শাল আর্ট পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্খীদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সমগ্র দেশব্যাপী ক্লাব/সংগঠনসমূহের উদ্যোগে যথাযথ গুরুত্বের সাথে ও আড়ম্বরপূর্ণভাবে এই দিবসটি উদযাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এই আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত সকলকে বাংলাদেশ উশু ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন ২০২০ সালে ইউনেস্কো ‘তাই-চি’ কে বিশ্ব মানবতার অননুভবনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (UNESCO List of Intangible Cultural Heritage of Humanity) এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য আসন্ন ইউনেস্কো মহাসম্মেলনে ‘তাইচি-চিয়ান দিবস’কে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা। তিনি আরও বলেন আন্তর্জাতিক উশু ফেডারেশন কর্তৃক ‘উশু’ কে ‘অলিম্পিক গেমস’-এ অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে সমন্বিত প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন আজকের দিনটি শুধুমাত্র একটি খেলার দিন নয়, বরং একটি সংস্কৃতি, একটি দর্শন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও মনোবলের উৎসব। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল অতিথি, বিশেষ করে যাঁরা উৎসাহ দিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন তাদের উপস্থিতি খেলোয়াড়দের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা। তিনি উশুকে প্রাচীন চীনা মার্শাল আর্ট থেকে আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পূর্ণাঙ্গ খেলাধুলা হিসেবে বর্ণনা করেন যাতে আত্মরক্ষা, সৌন্দর্য, দেহের নমনীয়তা, একাগ্রতা এবং মানসিক শক্তির সমন্বয় রয়েছে। তিনি বলেন তরুণ প্রজন্ম উশু অনুশীলনের মাধ্যমে শুধু শরীরচর্চা করে না, তারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলা গড়ে তোলে যা জাতি গঠনের জন্য জরুরি।
তিনি বলেন বাংলাদেশ উশু ফেডারেশন গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণে সহায়তা করছে। তিনি উল্লেখ করেন দেশের খেলোয়াড়রা সাউথ এশিয়ান গেমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জিতে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। তবে তিনি এখানেই থেমে থাকতে না চাওয়ার কথা বলেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উশুর প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেওয়া, শহর ও গ্রামের কিশোর-কিশোরীকে উশুর মাধ্যমে সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী এবং সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা জানান। তিনি বলেন তারা শীঘ্রই জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজন, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে উশু ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন এবং উশুকে শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য গর্বের প্রতীক হিসেবে দেখতে চান।
শিক্ষার্থী খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন আজকের দিনটি তাদের জন্য। তিনি তাদের ঘাম, পরিশ্রম আর নিষ্ঠাকে সবচেয়ে বড় সম্পদ আখ্যা দেন এবং পরামর্শ দেন সফলতা রাতারাতি আসে না, নিয়ম মেনে চর্চা করলে একদিন বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশকে তুলে ধরা সম্ভব। তিনি প্রশিক্ষকবৃন্দ, ফেডারেশনের কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দ এবং সকল মিডিয়াকর্মীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান যারা সীমিত সুযোগে দেশের সেরা উশু প্রতিভা তৈরি করছেন, নিরলসভাবে আয়োজন সফল করছেন এবং এই আয়োজনের বার্তা সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শেষে তিনি সবাইকে মিলে উশু চর্চাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং একদিন বিশ্ব উশু দিবসে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চান।