9 April 2022, 3:07 AM
দৃষ্টির যেখানে শেষ, কল্পনার সেখান থেকেই শুরু। অবসর মুহুর্তে প্রায় সময় যখনই কল্পনার আশ্রয় নিতাম, মন চলে যেতো সেই সুদুর সৌদিআরবে।
সেই আশার বানী কবে শুনবো, কবে দেখবো। আমার জান্নাতের মায়াবী পাথরখানা, স্পর্শ করবো আর চুমো খাবো। কবে কাবার চতুর্দিকে ঘুওে বলবো লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।
স্বপ্নতো বাস্তােব পরিণত হয়ে গেলো একদিন। কিসে আল্লাহ তায়ালা’র মেহেরবান হঠাৎ দাওয়াত এসে গেলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমরা দুজন আর আমাদেও ছোট ছেলে মাসিক প্রস্তুতি নিলাম সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ার জন্য।
ঋাবতে এখনো অবাক লাগে কিভাবে বাস্তব হলো। ( ২০১৩ এর ২৫ মে)। টিকেট হয়ে গেলো সৌদি আরবে যাত্রার জন্যে। ২৫ তারিখ কখন আসবে, অপেক্ষার প্রহর আর গুণতে বাকী রইলোনা, সত্যিই একদিন ২৫ মে এসে ই গেলো।
জোহরের নামাজ পড়ে ১টা ৩৫ মিনিটে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সাথে আমার মেয়ে নাবিলা, মেজ ছেলে নাঈম, ছোট ছেলে নাদিম। আমরা দুজন। বড় ছেলে নোমান বাসায় না থাকার কারণে এয়ারপোর্টে গিয়ে আমাদেরকে বিদায় জানানো সম্ভব হয়নি। ছোট ভাই মামুন যখন আমাদেরকে নিয়ে বিমানবন্দওে রওয়ানা হলো রাস্তায় কিসে যানজট, একটা এক্সিডেন্ট হওয়ার কারণে একেবাওে শেষ সময়ে বিমানবন্দওে গিয়ে পৌঁছলাম। জর্ডান এয়ারলাইন্সে কওে সৌদিআরবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
আল্লাহ তায়ালা’র মেহেরবান। ৫ ঘন্টায় গিয়ে আমরা বিমানবন্দওে পৌঁছলাম। ট্রানজিট ফ্লাইট থাকার কারণে সেখানে ২ ঘন্টা অপেক্ষ করতে হয়েছে। তেমন কষ্ট হয়নি, এহরাম বাঁধা আর খানিকটা গল্পে পার হলে গেল ২ ঘন্টা। আবার জর্ডান এয়ারলাইনন্সে জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। বসতে না বসতেই মাত্র দেড় ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম জেদ্দা।
জেদ্দা এয়ারপোর্ট সেখানে চাচা আমাদেরকে নিতে এসেছেন। এয়ারপোর্ট পার হতেই ভোর সাড়ে ৭টা। আমাদেও টিকেটের প্যাকেট এর কথা অনুযায়ী প্রাইভেট কার এসে গেলো ১৫ মিনিটের মধ্যেই। মক্কায় যেতে রাস্তার দুপাশে সারি সারি খেজুরের গাছ দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো। এ যেনো এক ভীষণ ভালো লাগার ব্যাপার। মক্কায় যেতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লেগে যায়, ইতোমধ্যে আমার ছেলেটা কিছু ঘুম সেওে নিল। কিছুটা দূরেই মক্কা নগরী।
এক্কায় পৌঁছুতে কেমন জানি একটা টেনশন কাজ করছিল। কোথায় যেনো কি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কারণ, সৌদি আরবে এই প্রথম আমাদেও সফর। গাড়ি গিয়ে থামলো একটা হোটেলের সামনে। আমাদেও প্যাকেজের নাম অনুযায়ী হোটেলটা বন্ধ ছিল, হয়তোবা কোনো কারণে। তাই অন্য একটা হোটেলে গিয়ে উঠলাম। হাত মুখ ধুয়ে অজু সেওে বায়তুল্লা শরীফ তাওয়াফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। হোটেল থেকে প্রায় ৭ মিনিটের পথ পার হলাম পায়ে হেটে।
চাচা আমাদেও দাঁড় করিয়ে অজু করতে গেলেন হারাম এর অজুখানায়। আমরা তখন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম চাচা জন্য। পারদিকে তাকাচ্ছিলাম আর অপেক্ষায় প্রহর গুণছিলাম। কোন দিক দিয়ে যেনো কাবা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এদিক ওদিক প্রচন্ড উদ্বেগ নিয়ে শুধুই তাকাচ্ছিলাম। চাচা অজু সেওে আসলেন। মুয়াল্লিমকে সঙ্গে নিয়ে হারাম এর ভিতওে প্রবেশ করলাম।
কি যে এক শান্তির অনুভূতির সঞ্চার হয়েছিল, কাউকে বুঝাবার নয়। সেদিনটি ছিল ২৬ মে। আমাদেও ১৮তম বিবাহ বার্ষিকী। কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা এই দিনটিতে আমাদেও নিয়ে গেছেন আমাদেও প্রিয় ভূমি মক্কায়।
হারাম শরীফের পাশেই মাকামে ইব্রাহীম এর কাছ থেকে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ঘরটাকে অনেকক্ষণ প্রাণভওে দেখলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, সত্যিই কি আমি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সেই দুষ্টু আবাবিল পাখিগুলো কাবার চতুর্দিকে উড়াউড়ি করছিল। দুষ্টু পাখিগুলোর এই ব্যস্ত থাকার দৃশ্য দেখে যেনো মনে হলো আজো তারা বাদশাহ আবরাহার কাছ থেকে আলগে রাখছে আল্লাহর ঘরটাকে।
এতো সুন্দও কালো কাপড়ে সোনালী সুতোয় কাজ করা গিলাফ দেখে যেনো খুশীতে আত্মহারা, এ আনন্দ কাউকে বুঝাবার নয়, অন্তওে যেনো একটা খুশীর বন্যা এসে গেলো। তাওয়াফ শুরু করলাম। মনের আনন্দে কখন যে এতো তাড়াতাড়ি তাওয়াফ শেষ হয়ে গেল। তারপর ২ রাকাত নামাজ আদায় কওে সাফা/ মারওয়াতে সাঈ শেষে দু রাকাত নামাজ শেষে হোটেলে ফিওে গেলাম। এতো ভালো সময় জানিনা আর কখন পার করবো। আল্লাহ ঘরের সামননে গিয়ে এই পৃথিবীর কোন দায়িত্বকে মনে রাখতে পারিনি, পারিনি আমার নিজের কথা ভাবতে।
এতো ভালো লাগা, ভালোবাসার ঘর খানায়ে াবা, আমার প্রিয় স্থান। প্রতিটি মুসলমানের প্রিয় স্থান সেখানে ৫দিন অতিবাহিত কওে, এক প্রশান্তির আচ্ছাদনে থেকে যেনো এটাই বোধগম্য হল, পৃথিবীতে এর চেয়ে শান্তির জায়গা আর কোথাও নেই, নেই কোন তুলনার স্থান।
ৃ.. পরদিন ভোওে মদীনায় চলে যাবো। মদীনায় যাওয়ার আগে জান্নাতুল মুয়াল্লাতে মা খাদিজা (রা.) এর কবর জিয়ারত করলাম। এক ছেলেকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন নীরবে মা খাদিজা (রা.) পাশে অনেক সাহাবীদেও কবর। মা খাদিজা (রা.) এর কবর জিয়ারতের পর ফিওে আসলাম হারাম শরীফে। পরপর তিনদিন গিয়েও ভিড়তে পারিনি হাজওে আসওয়াদ কালো পাথরের কিনাওে নিকটে গিয়েও যেনো কত মানুষের ভিড় কাউকে বুঝাবার নয়। আজও কাল পাথরের ছোয়া পাইনি। মনটা ভীষণ খারাপ। বুধবার রাত ১টা। এক আত্মীয়ের কাছে ছেলেকে রেখে এগুতে থাকলাম কাবার দিকে। ৭৯ নং গেইট পার হয়ে আমরা দুজন সোজা একটু জোওে হেটে রওয়ানা হলাম কালো পাথরের দিকে। কিভাবে জান্নাতের পাথর খানাটিকে স্পর্শ করবো, চুমো খাবো, হাজারো আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে দরখাস্ত নিবেদন করলাম, আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে রাত ১টা ২০ মিনিটে পাথরটিকে স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়েছিল দুজনেরই। আল্লাহর শোকর আদায় কওে বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন কওে চলে এলাম হোটেলে।
ঈরদিন সকাল ১১টায় মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মদীনা যেতে ৫ ঘন্টার রাস্তা। রাস্তার দু’ধাওে পাহাড় আর পাহাড়, মরুভূমি ধূ-ধূ বালুচর। অর্ধেক পথ যেতে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর মা আমিনা এবং বাবা আব্দুল্লাহ’র কবর দেখতে পেলাম আবওয়া নামক স্থানে। গুমিয়ে আছেন ১৪০০ বছর ধরে। মরুভূমির পথ ধওে ৫ ঘন্টার এ যাত্রা শেষ হলো। বদও প্রান্তর দেখার খুবই ইচ্ছা ছিলো। তবে সময় সংকীর্ণতার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি।
মদীনায় গিয়ে পৌঁছালাম। আলহামদুল্লিাহ। হোটেলে গিয়ে নামা সেওে মাগরিবের আগে মসজিদে নব্বীতে গিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। অন্তওে যেনো কি এক অনুভূতি আমাদেও প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র
হাতে গড়া খেজুরের ডাল দিয়ে যার ভিত্তিপ্রস্থর সাথে আমাদেও প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর সাহাবীদেও স্পর্শে ধন্য এ পবিত্র মসজিদে নব্বী, এমন এতই আকর্ষণীয়, এতোটা অপূর্ব সুন্দও যা বর্ণনা করবার মতো নয়।
রহমত আর বরকতে পরিপূর্ণ মসজিদে নব্বীতে ঘুমিয়ে আছেন আমাদেও প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.), পাশে আবু বকর (রা.) এবং ওমর (রা.)। মহিলাদেও মেই গেইটে যাওয়ার অনুমতি নেই। তাই দূও থেকে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জিয়ারত করলাম, রিয়াদুল জান্নাতে নফল নামাজ, দুরূদ শরীফ পড়ে তারপর ২৫নং গেইট দিয়ে রাত ১টার সময় চলে আসলাম হোটেলে।
পরদি বাদ ফজর উহুদেও পাহাড় দেখতে, বেরুলাম। সেই রক্তে রঞ্জিত (শহীদদের) নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ পাহাড় আজো সাক্ষ্য বহন করছে অতিতে। উহুদ পাহাড়ের পাশেই ঘুমিয়ে আছেন চিরনিদ্রায় আবু হামযা (রা.) সহ ৭০ জন সাহাবী। উহুদেও যুদ্ধে আবু হামযা (রা.) সহ ৭০ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। উহুদেও পাহাড় পর্যবেক্ষণ কওে মনে যেনো এক অশান্ত ভাবের সৃষ্টি হল। হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর চাচা হামযা (রা.) এর এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে আমাদেও নবী (সা.) চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন উহুদেও পাহাড়। রক্তে রঞ্জিত এ উহুদেও পাহাড় আজো পর্যবেক্ষকদেও চোখের জল আটকে রাখতে পারেনা। পারেনা আমাদেও ভুলাতে আমাদের।
প্রিয় নবী, হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর আহত হবার ঘটনা। আমাদেও নবী (সা.) এর দুটো দাঁত মোবারক এর এখানে অবসান ঘটেছিল এসব কথা মনে এসে এতো কষ্ট হয়েছিল সেদিন তা কাউকে বুঝাবার নয়। অন্তরের দৃষ্টিকোণ থেকে যেনো দেখছিলাম উহুদ আজো কাঁদছে বসে আমাদেও প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর বাহিনীর পরাজয় দেখে। আজো যেনো প্রতিশোধের জন্য কাঁদছে উহুদ। নির্বাক চোখে তাকাচ্ছিলাম আর বেশী সময় দাঁড়িয়ে থাকার সময় হলনা। সেখান থেকে চলে গেলাম মা ফাতেমা’র বাড়ী দেখতে। তারপর হযরত ওমর (রা.) এর মসজিদে দু’ রাকাত নামাজ (নফল) আদায় কওে, তারপর মসজিদে কিবলা, মসজিদে কুবা’তে আরো দু’ রাকাত কওে নফল নামাজ আদায় করলাম।
জান্নাতুল বাকী দেখবার সৌভাগ্য আমাদেও হয়নি। বাদ ফজর এবং বাদ আছর ছাড়া জান্নাতুল বাকীর মেইন গেইট তালাবদ্ধ থাকে। তাই দেয়ালের ওপাশ থেকেই জিয়ারত করলাম। মহিলাদেও গেইটের ভেতওে এমনিতেই যাওয়ার কোন নিয়ম নেই। বাকী জিয়ারতের প্রশান্তি আজো অবসর হলে মনের মধ্যে দাগ কাটে। কারণ হাজার হাজার সাহাবীরা এখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন। মা ফাতেমা (রা.), মা আয়শা (রা.), উসমান (রা.)সহ হাজার হাজার সাহাবী/সাহাবা। দেয়ালের ওপাশ থেকে কেন জানি এক প্রশান্তির আভাস উপলব্ধি করছিলাম, আজো অবসর মুহুর্তে একাকিত্বে মনের মাঝে নাড়া দেয়া সেই অনুভূতি।
পরদিন সকালে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। রাত ২টায় হোটেল থেকে রওয়ানা হলাম। এয়ারপোর্টে এসে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। কিছুক্ষণ পর আমাদেও ফ্লাইট অপেক্ষা করছিলাম প্লেনে উঠার সময় হবার ।
বাস্তব সুন্দও এ অভিজ্ঞতার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে লক্ষ কোটি শুকরিয়া আদায় করি। স্বচক্ষে আল্লাহর ঘর দেখার আবারো আশা রাখি রাব্বুল আলামিনের কাছে। আমার চর সন্তানসহ যখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে দাওয়াত আসবে। শান্তির এ যাত্রা যেনো শুভ হয়, দোআ চাই আমার শুভাকাঙিক্ষদেও কাছে। প্রত্যাশার আলো যেনো জ্বলে উঠে একাধিকবার। আল্লাহ তায়ালা যেনো আমাদের এ বাসনা পূর্ণ করেন। আমিন।
লেখিকা: আমিনা চৌধুরী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী।