20 January 2022, 5:01 PM
তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া
আব্বা মারা গেলেন কোলের উপর। মারা যাওয়ার আগ মুহূর্তে চোখ বড় বড় করে ভীত গলায় বললেন, আম্মা গো দেহো তো খাটের তলায় কী জানি বইয়া রইছে। ঐ যে ছায়া ছায়া দেহা যাইতাছে।
জেসমিন নিজের কান্না গিলে ফেলে কাঁপা গলায় বলল, আয়াতুল কুরসী পড়েন আব্বা। খাটের তলায় কিছু নাই। আমার সাথে পড়েন
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়ুম….
সোবহান মিয়া জড়ানো কণ্ঠে আয়াতুল কুরসী পড়লেন। পড়া শেষ করেই সে তারস্বরে ডাকলেন, শফিকের মা, শফিকের মা।
শফিক, রফিক কই গেছে?
শফিক এগিয়ে এসে বাবার হাত ধরলো এই যে আব্বা আমরা এইহানেই তো।
সোবহান মিয়ার চোখের কোণে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। সারা গা ঠান্ডা। চোখ দুটো ফ্যাকাশে। ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, আমার জেসমিন, ইয়াসমিনরে তোমরা দুই ভাই দেইখো।
কিছুক্ষণ পরই সোবহান মিয়ার চোখ উল্টে গেল। গোঙানির মত শব্দ হলো। শফিকের মা চামচে করে মুখে পানি দিলেন। পানি গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল।
তখন ফজরের আযান হচ্ছে। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম।
বাদুড়েরা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। আর সেই সময় জেসমিন বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলো, ‘ ও আব্বা গো…’
সেই কত বছর আগের কথা আজ হঠাৎ বাবার কথা জেসমিনের মনে পড়ছে। মারা যাওয়ার আগে সোবহান মিয়া বড় দুই ছেলের কাছে শেষ অনুরোধ করে গিয়েছিলেন যেন ওদেরকে দেখে রাখে। দেখে রাখছেই বটে।
এইতো কিছুক্ষণ আগে বড় কাতল মাছের মাথাটা জেসমিনের পাতে তুলে দিলেন বড় ভাবী। হাসিমুখে বললেন, মাথাটা তুমি খাও। তোমার মিয়াভাই শখ কইরা বড় মাছ কিনা আনছে। জেসমিন রাগ, গোস্যা রাইখো না। হেইদিন কী না কী কইছি ভুইলা যাও,
জেসমিন মাথা নিচু করে উত্তর দিল, আমি কিছু মনে রাখি নাই ভাবী।
এরই মধ্যে আয়েশা চোখ ইশারা করলো শফিকের দিকে, এই কও না! কী জানি কইবা জেসমিনরে। আয়েশা মৃদু হেসে বলল,
জেসমিন, তোমার মিয়াভাই একটা কথা কইতে চায় তোমারে।
শফিক আরও একটা লাউয়ের টুকরা জেসমিনের পাতে তুলে দিতে দিতে বলল,
-আরে কিছুই তো খাইতাছোস না। খা খা।
ব্যাপার হইলো কী বিথীর বিয়ার সম্বন্ধ আইছে। বিশাল বড় ঘর। মাইয়া বিয়া দিমু। পরিবারের মইধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ তো ভালা জিনিস না আর বাড়ি ঘরও তো ঠিকঠাক করন দরকার তাই না?
তুই কী কস?
জেসমিন মৃদু গলায় বলল, হ তা তো দরকারই।
-আমি কইছিলাম কী একটা নতুন ঘর তুলমু। আব্বা তো তোর নামে উত্তর চরার জমি লেইখা দিছে।
তোর জামাই নাই, পোলাপান নাই তুই জমি দিয়া কী করবি?
আমার দুই মাইয়া বিথী,তিথি আর রফিকের পোলাডা এরাই তো তোর পোলাপান তাই না? তুই ঐ জমিটা আমার নামে লেইখা দে বইন। আমার ভাগে যেইটা পড়ছে ঐডা অত সুবিধার না।
জেসমিন এবার ভাতের থালা নিয়ে চুপ করে বসে রইলো। ভাত আর গলা দিয়ে নামলো না। হঠাৎ করে এত আপ্যায়নের মানে এবার ধরা গেল। মাস তিনেক আগেও যেখানে মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল সেখানে আজ এত সেধে খাওয়ানোর মর্ম আগে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মাস তিনেক আগেই ভাইয়ের ছুঁড়ে দেয়া পিঁড়ির আঘাতে কপালের কাটা দাগ এখনও আছে। সেই আঘাত আরও উস্কে গেল আজ।
যে ভাবী মিষ্টি সুরে কথা বলছেন সেও ঠিক ঐ সময় হিংস্র বাঘিনীর মত কোমরে আঁচল বেঁধে ছুটে এসে ক্রুদ্ধ গলায় বলেছিলেন, ছিনাল মাগী জামাইয়ের ঘর এর লাইগাই কপালে সয় নাই। পুরুষ মাইনসেরে শইল দেহাইয়া পাগল বানাস আর দোষ দিতাছোস আমার ভাইয়ের। এই বিথীর বাপ তুমি কিছু কও না ক্যান?
শফিক হাতের কাছে থাকা পিঁড়ি ছুঁড়ে দিয়েছিল জেসমিনের কপাল বরাবর। চিৎকার করে বলেছিল, মরে না ক্যান এই হারামজাদী? মরে না ক্যান?
দোষ জেসমিনেরই বটে। কল পাড়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভাবীর ছোট ভাই গোসলরত অবস্থায় দেখছিল ওকে।
সেটা টের পেয়ে বাইরে গিয়ে জেসমিন চেঁচিয়ে বলেছিল, এইহানে কী করেন আপনে? আপনের সাহস তো কম না। চোখ তুইলা ফেলমু এক্কেবারে।
এই তো দোষী সাব্যস্ত করা হলো জেসমিনকে। অভিমানে বড় ভাই ভাবীর সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
ছোট ভাই বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই আলাদা বাড়ি করেছে। ছোট ভাবী এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই পাগলের দেখভাল আমি করতে পারুম না। আমি কি এই বাড়ির বান্দী?
পাগল বলে সাব্যস্ত করেছিল প্রতিবন্ধী ইয়াসমিনকে। যে কিনা হাঁটাচলা করতে পারে না। মায়ের মৃত্যুর পর তাকে দেখার সমস্ত দায়িত্ব পড়লো জেসমিনের উপর। মাত্র তিন মাসের মাথায় তালাকপ্রাপ্তা বোনকে আরও একবার বিয়ে না দেয়ার পেছনে এটা ছিল অকাট্য গোপনীয় কারণ। ইয়াসমিনকে কে দেখবে?
বুকের ভেতরে উথলে উঠা প্রেম সেই তো কবেই মাটি চাপা দিতে হয়েছে।
জেসমিনের মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেদিনের কথা।
একেবারে ভোরে উঠে শিউলী তলায় যেত ও। উত্তরের হিম হিম হাওয়া কাঁপন ধরিয়ে দিত। শিশির কণায় ঘাসের ডগা সিক্ত হয়ে থাকতো। শিশির মাড়িয়ে চাদর গায়ে এক কিশোরী ফুল কুড়াতে যেত শিউলী তলায়। আনমনে গুণগুণ করে গান গেয়ে শুভ্র শিউলী কুড়াতো সে। হঠাৎ কারো কাশির শব্দে লাফিয়ে উঠতো।
ইউসুফ এক গাল হেসে বলতো, ডরাইছো?
জেসমিন কপট রাগ করার অভিনয় করে বলতো, এইহানে কী করেন?
-আমিও ফুল কুড়াইতে আইলাম। এমন কইরা লম্বা চুল ছাইড়া ফুল কুড়াও তোমারে জ্বিনে ধরবো দেইখো। এই বলেই ইউসুফ হেসেই খুন।
জেসমিন মুখ বাকিয়ে বলতো, আমারে জ্বিনে ধরলে আপনের কী? আপনে যান তো। মাইনসে দেখলে খারাপ কইবো। আর মিয়া ভাই যদি জানে আপনের ঠ্যাং ভাইঙা দিবো কইলাম।
-ঠিক আছে তাইলে মিয়া ভাইয়ের সামনে আমি না গেলাম। আম্মারে পাঠায়া দিমু। আম্মার ঠ্যাং তো আর ভাঙতে পারবো না।
ভেতরে ভেতরে জেসমিনের বুকের ভেতর কেমন একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। রঙিন প্রজাপতিরা মনের বাগানে এসে পাখা মেলে দিল। ওরা কি সুগন্ধি ফুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়েছে? হয়তো তাই। কী এক অদ্ভুত শিহরণ!
‘আমি গেলাম’ এই বলে জেসমিন খানিকটা লাজুক ভঙ্গিতে হেসে বিদায় নিল।
কিছুদূর গিয়ে আবার কী ভেবে ফিরে এলো। চাদরের ভেতর থেকে একটা নীল রঙা মাফলার ইউসুফের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ঠান্ডার মইধ্যে ঘুরেন খালি। ধরেন। এমনেই দিলাম।
এই বলেই সে দূরন্ত হরিণীর মত ছুটে গেল। তখন সেই শিউলী গাছে ঠেস দিয়ে ইউসুফ দরাজ গলায় গাইছিল,
কাছের মানুষ দূরে থুইয়া
মরি আমি ধরফরাইয়া
দারুণ জ্বালা দিবানিশি…..
এই ঘটনার মাত্র সাতদিন পরই ধুমধাম করে জেসমিনের বিয়ে হলো। পাড়ার যে মেয়েটি সাজিয়ে দিচ্ছে সে কোনোমতেই জেসমিনের চোখে কাজল দিতে পারছে না। চোখের জলে কাজল ধুয়ে যাচ্ছিলো বারবার। মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, এমনে কানলে কাজল দিয়া দিমু ক্যামনে?
সেই কাজলের জলে কার নাম লেখা ছিল? ইউসুফের?
জেসমিনের স্বামী মালয়েশিয়া প্রবাসী। বড় দুই ভাইয়ের পছন্দ। এস.এস.সি পাস করা একজন কিশোরীর মতামত নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ইউসুফের মাকে তারা সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ইউসুফ বা জেসমিন কারো কিছু বলার ছিল না কিংবা কে জানে হয়ত অনেক কিছুই বলার ছিল।
যখন অনেক কিছুই বলার থাকে, অনেক ব্যথায় কাতরে মরে সম্ভবত তখন মানুষ নৈঃশব্দ বেছে নেয়। কখনও কখনও নৈঃশব্দ বেদনা প্রকাশের কঠোর প্রতিবাদী ভাষা। ভালোবাসার মানুষকে না পেলেও অন্য কারো কাছে ভালো থাকতে দেয়াটাও শুদ্ধতম ভালোবাসা,
জেসমিনের বিয়ের পনের দিন পরই স্বামী চলে গেল মালয়েশিয়া। দিন দিন যোগাযোগ কমাতে থাকলো সে। মাস তিনেক পর জানা গেল সে অনেক আগেই বিদেশে বউ বাচ্চা নিয়ে পরম শান্তিতে সংসার করছে। ঘটনা জানাজানির পর স্বামী সযতেœ তালাকনামা পাঠিয়েছে।
তালাকপ্রাপ্তা সেই নারীর বয়স এখন পঁয়ত্রিশ ছুঁই ছুঁই।
এলোমেলো লম্বা চুলের একটা মেয়ে ছোট বাচ্চাদের সাথে হৈ হুল্লোড় করে বেড়াচ্ছে। জেসমিন মুগ্ধ চোখে মেয়েটাকে দেখছে। সরু সরু আঙুল, চিবুকে তিল। কেমন মায়াবী মুখ!
জেসমিন মেয়েটাকে কাছে ডাকলো, এইটে পইড়া ছোট পোলাপানের সাথে খেলাধুলা খালি। বড় হবি কবে? চুল এমন পাখির বাসা বানায়া রাখোস ক্যান? এইদিক আয় আঁচড়ায়া দেই।
জেসমিন পরম যতেœ চুল আঁচড়ে দেয়। জেসমিনের চোখ অকারণে ভিজে উঠছে। এই মেয়েটা তো তার হতে পারতো। পারতো না?
এই মেয়েটা বাবার নামের জায়গায় ইউসুফের নাম লিখে আর মায়ের নামের জায়গায় অন্য কারো নাম। ইউসুফের স্ত্রীর নাম কি জেসমিন মনে করতে পারছে না।
জল জোছনায় খেলা করা এক নদীর ধার ঘেষে একটা বাড়ি তার হতে পারতো। সেই বাড়িতে মস্ত একটা শিউলী গাছ থাকতে পারতো। প্রতিদিন ভোরে উঠোন জুড়ে শিউলীরা সুবাস ছড়াতো। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় কাঁপন ধরে যেত।
কেউ একজন হয়ত ফুল কুড়িয়ে এনে দিতো।
লম্বা চুলের এই মেয়েটাকে নিয়ম করে চুলে তেল দিয়ে বেনী করে দিতো। মাঝে মাঝে লাজুক ভঙ্গিতে স্বামীর বুকে মুখ লুকাতো। জীবনটা তো এমন হতে পারতো। পারতো না?
এই জীবনে যারা খুব অল্প জিনিস চায় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারা সেই অল্প জিনিসটুকুও পায় না। দিনশেষে তাদের ক্ষতি আর ক্ষতের পাল্লা ভারী।
উত্তর চরায় নতুন ঘর তোলা প্রায় শেষ। শফিক, আয়েশা, বিথী, তিথি নতুন ঘর দেখতে গিয়েছে। পুরনো বাড়ি ফাঁকা। জেসমিন আর ইয়াসমিন আছে কেবল।
ইয়াসমিনকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে জেসমিন। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেল। জেসমিন মোমবাতি ধরালো। রাখলো পাশেই।
এরই মধ্যে ইয়াসমিনের উঠল হেঁচকি। ঘরে পানি নেই এক ফোঁটা। জগটা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে পানি আনতে গেল জেসমিন। কলপাড় খানিকটা দূরে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি আগুন আগুন….
জেসমিন দৌড়ে গিয়ে দেখে ঘর দাউদাউ করে জ্বলছে। ইয়াসমিন রে বলে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো জেসমিন। প্রতিবন্ধী বোনটার একলা বের হওয়ার সাধ্য নেই। আগুনের লেলিহান শিখায় পুরনো ঘর একেবারে ছাই হলো। তাতে কী উত্তর চরায় নতুন ঘর উঠেছে।
জোহরের নামাজ শেষে আগুনে পুড়ে যাওয়া জোড়া লাশ দাফন করা হলো। শিউলী তলায় নীল রঙা মাফলার পরা মাঝ বয়সী এক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। তার কি তখনও গাইতে ইচ্ছে করছে,
কাছের মানুষ দূরে থুইয়া
মরি আমি ধরফরাইয়া…
সে গাছের নিচে পড়ে থাকা ম্লান হওয়া শিউলী দেখছে। ভোরের সতেজ শিউলী পায়ের তলায় পিষ্ট হয়েছে। তার সৌন্দর্য ভোরের মত নেই। আহা শিউলী তোমায় যতœ করে কুড়ানোর কেউ ছিল না!
লেখক: শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।