19 June 2026, 4:35 PM
নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুনভাবে দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছে।একই সাথে ঐতিহ্যবাহী ডেগগুলো সিলগালা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেল ৩টার দিকে মাজার প্রাঙ্গণে একটি প্রধান দানবাক্সসহ বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি ছোট বাক্স বসানো হয়। বাক্সগুলোর নিরাপত্তায় আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লার নেতৃত্বে সিলগালা করা হয় এবং দানবাক্সগুলো স্থাপন করা হয়।
অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা বলেন, ‘মাজারের দান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরো সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এখন থেকে ভক্তদের দেয়া সকল দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকা এই বাক্সগুলোতে জমা হবে।’
এর আগে গত শুক্রবার(১২ জুন) সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর দরগা পরিদর্শন করেন।
এসময় সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন,“হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজার শুধু সিলেট অঞ্চলের নয়,সারা বাংলাদেশের একটি নেয়ামত ও গর্ব এটি।এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে:মাজার,মসজিদ ও মাদরাসা।তিনটির সমন্বয়ে ইসলামী কমপ্লেক্স হোক।মাদ্রাসাটি হোক ভাল মানের মাদ্রাসা,দ্বিতীয় দেওবন্দের মতো হোক।মসজিদ হোক স্থাপত্যকীর্তি ও নান্দনিক।আগন্তুকরা যেন এসে ভালভাবে নামাজ পড়তে পারে।মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা হবে আমল ও এলেমে জগত ইশারা।”
জেলা প্রশাসক আরো বলেন,মাজারটি হোক অত্যাধুনিক,নান্দনিক। ভক্তরা যেন এসে পায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।তিনি বলেন,প্রকৃত অর্থে এটি এমন হোক যে কারণে হযরত শাহজালাল এখানে এসেছিলেন, ইসলামের আলো প্রচার ও প্রসারের জন্য সেটি তেমনই হোক।
এসময় মাজারের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে জেলা প্রশাসক বলেন,এটির একটি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।জেলা প্রশাসক জানান,সরকার ৩০কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজালাল মাজারে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছে।মাজারের আধুনিকায়নে সরকার কাজ শুরু করেছে।৩০ কোটির মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২৫ কোটি,মাজার কর্তৃপক্ষ দিবে ৫ কোটি।তারা তা দিতে পারছে না।অপরদিকে মাজারের ৫ কোটির মধ্যে সিটি করপোরেশন দিচ্ছে ৩ কোটি।এরপরও বাকী ২ কোটি মাজার কর্তৃপক্ষ দিতে সক্ষম হচ্ছে না।বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে।প্লানিং কমিশন থেকে মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসেব দেখতে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি।
পরিদর্শনকালে তখন তার সাথে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা,জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ উপস্থিত ছিলেন।
সেসময় তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমরা শাহজালাল ও শাহপরাণ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাজারের ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রম এবং সার্বিক পরিবেশকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিষয় এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সিলেটের এই দুই ঐতিহাসিক মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ভক্তরা প্রতিদিন এখানে অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশুসহ নানা মূল্যবান সামগ্রী দান করেন। সেই বিপুল দানের অর্থ কোথায় যায়, কিভাবে ব্যয় হয় তার হিসাব রাখার দাবি উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর বিষয়টি নতুনভাবে গুরুত্ব পায়। সিলেট সিটি করপোরেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অস্বচ্ছতার চিত্র সামনে আসে। পরে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে ওয়াকফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এক সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: সারওয়ার আলম বলেন, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে।
এ সময়ের মধ্যে দানের উৎস, ব্যয়ের খাত ও সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার চিত্র পর্যালোচনা করা হবে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ ও নিয়মিত অডিটের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
এতে জেলা প্রশাসক বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরা বেকায়দায় পড়েন। তাই মাজার-মাদরাসা-মসজিদ- এই তিন স্থাপনার ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের উদ্যোগ নেবে সরকার।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনা করছে সরকার। এর আওতায় নান্দনিক মসজিদ তৈরি, নারীদের নামাজের স্থান, লাইব্রেরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তবে শিগগিরই নিরাপত্তা জোরদার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং টয়লেটের সমস্যা সমাধান করা হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার প্রশাসনের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হলো।দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের এই দুই ঐতিহাসিক মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল মানুষের মাঝে।সাধারণ জনগণ,পর্যটক ও ভক্তদের বিপুল দানের অর্থ কোথায় যায়, কীভাবে ব্যয় হয় তার সুষ্ঠু কোনো হিসাব কখনো রাখা হয়নি।