30 June 2026, 10:55 AM
তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া
আমার মায়ের যেদিন দ্বিতীয় বিয়ে হয় তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। বার্ষিক পরীক্ষা চলছে।
পড়তে পড়তে শীতের হিমেল হাওয়ায় হাত- পা ঠান্ডা হয়ে জমে থাকে৷ কম্বল গায়ে দিয়ে পড়তে বসি। একটু পর পর মা এসে খোঁজ নিয়ে যান উষ্ণ কম্বলের আরামে ঘুমিয়ে গেলাম কিনা৷
মা সেদিনও দেখতে এসেছিলেন পড়ছি কিনা। আমি কম্বল গায়ে শুয়েছিলাম।
মা এসে ধমকের সুরে বললেন, কী ব্যাপার রবিবার ক্যামেস্ট্রি পরীক্ষা না? পড়ছো না কেন?
মায়ের ধমক শুনেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মাথার ভেতরে মনে হয় আগ্নেয়গিরি তিড়বিড় করে জ্বলছিল। আমি কম্বল থেকে মুখ বের করে চিৎকার করে বলে উঠলাম,আমাকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। যে মা এত বড় সন্তান রেখে অন্য লোকের কাছে বিয়ে বসতে পারে তার তো এত চিন্তা মানায় না। আমি আর কোনো পরীক্ষা দেব না।
মা যেন হঠাৎ চমকে উঠলেন, তার এত বাধ্যগত সন্তান এইভাবে আঘাত করে কথা বলতে পারে তিনি ভাবতেও পারেননি।
শুধু নরম সুরে বললেন, আমি ঠিক কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি তুমি বড় হলে বুঝবে তানভীর।
আমি চোখ গরম করে বললাম, হ্যা বুঝি তো। শুধু অন্য লোকের কাছে শোয়ার জন্য বিয়ে করবে। ছি! তোমাকে মা বলতে আমার ঘৃণা হয়।
রেহনুমা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। দৌড়ে তানভীরের রুম থেকে চলে এলো। তার বুক ধরফর করছে। মাথা ভনভন করছে। ঘাড়ের পেছনে ব্যথা করছে। সম্ভবত প্রেসার বেড়ে গেছে। বড় বড় চোখ জলে ভরে গেছে। বারান্দায় এসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
এমন জীবন তো হওয়ার কথা ছিল না। কত সাজানো একটা জীবন ছিল। একটা সড়ক দুর্ঘটনা জীবনটাকে খাদের কিনারে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আফসার হোসেন ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। একজন অসম্ভব ভদ্রলোক হিসেবে ছিল তার পরিবারে, সমাজে পরিচিতি।
রেহনুমাকে কী অসম্ভব ভালোবাসতেন তিনি! পারিবারিকভাবে বিয়ে করা এই মেয়েটি পরিবারের মধ্যমনি হয়েছিল অল্প কয়দিনেই। শ্বশুর -শ্বাশুড়ি, ননদ সবাই কেমন আগলে রাখতো। শ্বশুরবাড়ি নিয়ে মেয়েদের মনে যে আতঙ্ক বাসা বেঁধে থাকে সেই আতঙ্ক তুলোর মত উড়ে গিয়েছিল এই বাড়ি এসে।
একটা দুরন্ত হরিণীর মত ছুটে বেড়াতো রেহনুমা। সন্ধ্যা হলেই আফসার সাহেব তাকে নিয়ে যেতেন নদীর ধারে। যেখানে জোছনা খেলে বেড়ায় নদী আর গাছের সাথে। কুলকুল নদীর জল আছড়ে পড়ে তীরে। খিলখিল হাসির আওয়াজে যেন বাঁধ ভেঙে যায়।
এত আনন্দ আর সময়কে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা বৃথা যায়। সেই নদীর তীরে রেহনুমাকে একলা রেখে কোথায় হারিয়ে যায় আফসার। নদীরে ঢেউ তীরে নয় আছড়ে পড়ে বুকে। সন্ধ্যার সেই জোছনা এখন ঘোরতর অমাবস্যা।
রেহনুমা ছোট ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে। ছেলেটা কিছুই বোঝে না। ফ্যালফ্যাল করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কেবল।
ছোট ছেলেটার মুখে ভাষা নেই, ওকে নিয়ে কারো কোনো আশাও নেই। এই স্পেশাল চাইল্ড নিয়ে রেহনুমা পড়েছে বিপদে। বড় ছেলেটা সুস্থ, স্বাভাবিক। তার পড়ার খরচ,সাংসারিক আনুসঙ্গিক খরচে জীবন তখন ওষ্ঠাগত। নিম্নবিত্ত পরিবারের শ্বশুরবাড়ি রেহনুমাকে স্নেহ ছাড়া বিশেষ কোনো আর্থিক সাহায্য করতে পারেনি। তবুও রেহনুমা নিজেকে ভীষণ সুখী মনে করতো।
দ্বিতীয় এই বিয়ের সম্বন্ধ রেহনুমার শ্বশুরই এনেছেন। রেহনুমা তার শ্বশুরের হাত ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো, এটা আমার পক্ষে সম্ভব না বাবা।
তার শ্বশুর কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিলেন, আমি জানি কতটা কঠিন কিন্তু তোমার পরিস্থিতিও তো সহজ না মা। একটা অ্যাবনরমাল ছেলেকে নিয়ে তুমি কত কষ্টে আছো তা তো দেখতেই পারছি। আমাদের বয়স হয়েছে আমরাও তো সেভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারছি না। তোমার জীবনটা সুখের হোক । এইটুকুই কেবল চাওয়া।
অনেক ভেবেচিন্তে রেহনুমা দ্বিতীয়বার বিয়েতে রাজি হয়। লাবণ্যময়ী, কম বয়সী বিধবা একজন নারীর জন্য কত কাপুরুষ নিজেদের নোংরা লিপ্সা প্রকাশ করতে পারে সেটাও তার এই কয় বছরে দেখা হয়েছে।
একেবারেই স্বল্প পরিসরে রেহনুমা এবং নেহাল সাহেবের বিয়ে সম্পন্ন হলো।
তানভীর ওর বাবার ছবি বুকে জড়িয়ে সেদিন কাঁদলো দিনভর। দরজা বন্ধ করে বসে রইলো সারাদিন। মায়ের প্রতি, নতুন বাবার প্রতি এক অসম্ভব ঘৃণায় মন ভরে গেল। সুযোগ পেলে কোনোদিন গলা কেটে মেরে ফেলবে এমন পণও করলো মনে মনে।
তানভীরের পরীক্ষার পর মা ওকে নিয়ে গেল নতুন বাসায়। নেহাল সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন ক্যান্সারে। তিন বছরের এক মেয়ে নিয়ে নিজেও বিপাকে ছিলেন খুব। তানভীর মনে মনে নেহাল সাহেব আর তার মেয়েকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল এজন্য নতুন বাবার বাসায় গেল অনায়াসে।
মায়ের সাথে নেহাল সাহেবকে একটু হেসে কথা বলতে দেখলেই তানভীরের মাথায় আগুন জ্বলে যেত। নেহাল সাহেব কোনো দরকারে রেহনুমাকে কাছে ডাকলেই তানভীর ছুতো দিয়ে মাকে আটকে রাখতে চাইতো। রেহনুমার ঘরে দরজা দেয়া থাকলেই তানভীর এই ছুতো সেই ছুতো দিয়ে ঘরে ঢুকে যেত। কখনও বলতো এই ঘরে বোধ হয় গেঞ্জি রেখে গেছি। একটু পর এসে বলবে পানির বোতলটা খুঁজে পাচ্ছি না।
রেহনুমা সব বুঝতে পারতেন। সব বুঝেও নীরব থাকতেন। নেহাল সাহেব তানভীরকে কাছে ডেকে বসিয়ে বলতেন, তোমার একটা জ্যামিতি বক্স লাগবে বলো না কেন তানভীর? তোমার টিউশন ফি কিন্তু আমি দিয়ে দিয়েছি। তানভীর কিছুই বলে না। তানভীর যে তাকে অপছন্দ করে সেটা তিনি জানেন।
একদিন রেহনুমা তানভীরের ঘরে এক গ্লাস দুধ নিয়ে যাচ্ছিলো। খেয়াল করলো দরজা বন্ধ। ভাবলো ঘুমিয়ে গেছে বোধ হয়। কিন্তু কেমন একটা আওয়াজ হচ্ছিলো দেখে সে জানালা দিয়ে উঁকি দেয় আর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় রেহনুমার।
চিৎকার দিয়ে দুধের গ্লাস ফেলে দেয় সে। দরজায় গিয়ে জোরে নক করে রেহনুমা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে এক্ষুনি দরজা খোল তানভীর। তানভীর দরজা খুলে ফেলে ভয়ে। রেহনুমা এলোপাথাড়ি থাপ্পড় দিতে শুরু করে তানভীরকে। আর একটু হলেই তিন বছরের মেয়েটা মরে যেত। গলা টিপে ধরেছিল তানভীর।
রেহনুমা ভয়ে আতঙ্কে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
রেহনুমা তার আগের ঘরের শ্বশুর শ্বাশুড়িকে সব জানিয়ে দিল। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, তানভীরকে ও বাড়িতে রাখা মোটেই নিরাপদ না। ওকে যেন তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রয়োজন বোধে ওরা তানভীরকে মেসে পাঠিয়ে দিবে৷
রেহনুমা নেহাল সাহেবকে পুরো ঘটনা বলার সাহস পেল না শুধু বললো তানভীরকে ওর দাদুবাড়ি পাঠিয়ে দিব ওর এখানে থাকার দরকার নেই। নেহাল সাহেব এই কথার বিরোধিতা করলেন। আরে না কী যে বলো! তানভীর এই বাড়িতে থেকেই পড়ালেখা করবে৷
রেহনুমা তানভীরকে চোখে চোখে রাখতো এরপর থেকে। কেমন যেন মায়ের সাথে একটা দূরত্ব হয়ে গেল তানভীরের। বেশিরভাগ সময় রেহনুমা ব্যস্ত থাকতো তানভীরের ছোট ভাইকে নিয়ে।
ওকে খাওয়ানো, গোসল করানো, যাবতীয় দেখভাল নেহাল সাহেবও করতেন সমান তালেই। রেহনুমা মাঝে মাঝে ভাবতেন কী অসীম পূণ্যে তিনি নেহাল সাহবকে পেয়েছেন। দুটো সন্তান নিয়ে কত যে বিপাকে পড়েছিলেন সে।
একদিন হঠাৎ নেহাল সাহেব তানভীরের ঘরে গেল। ওর সামনে গিটার রেখে বললো, তোমার জন্মদিনের উপহার। তুমি নাকি খুব সুন্দর গান গাও। কই আমাকে তো কখনও গেয়ে শোনালে না। নেহাল সাহেব মৃদু হাসলেন। তানভীরও মুখেও স্মিত হাসির রেখা। না এই লোকটা তো খারাপ নয়।
তানভীর তখন এইচ.এস.সি পরীক্ষা দেবে। গভীর রাতে পড়ছিল। হঠাৎ ওয়াশরুমে ধুপ করে একটা বিকট শব্দ হলো। রেহনুমা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। নাক,মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল। হাসপাতালে নেয়ার পর পরই ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে রেহনুমাকে। স্ট্রোক করেছিল সে৷
তানভীর হাসপাতালে গিয়ে মা মা করে চিৎকার করে কাঁদছিল। বেঁচে থাকা অবস্থায় মাকে কত কথা বলে আঘাত করেছে। শেষমেশ মায়ের সাথে ভীষণ দূরত্বও হয়ে গিয়েছিল। আজ সেই দূরত্ব ঘোচার আর কোনো সুযোগ নেই। তানভীরকে জড়িয়ে ধরলো নেহাল সাহেব। তানভীর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছিল,বাবা মাকে উঠতে বলো। আমি আর কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করব না৷
নেহাল সাহেব পরম মমতায় তানভীরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। এই প্রথমবার সে তাকে বাবা বলে ডেকেছে। রেহনুমা বেঁচে থাকা অবস্থায় তা জানতে পারলো না।
মেঘে মেঘে তখন অনেক বেলা। কাঠগোলাপ ঝরে গেছে অবেলায়। মলিন কয়েকটা ফুল কুড়িয়ে হাতে পরম যত্নে রাখলো তানভীর । মায়ের পছন্দের ফুল ছিল। আজ কত বছর পর মাকে ভীষণ মনে পড়ছে। মা বেঁচে থাকলে জানতেন সেই ছোট্ট তানভীর দুদিন পর অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে স্কলারশিপ নিয়ে। অনার্স শেষ করে ফেলেছে সে।
এয়ারপোর্টে তানভীরকে এগিয়ে দিতে এসেছে সবাই। তানভীর ঝাপসা চোখে নেহাল সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন, নিজের খেয়াল রেখো বাবা। ওষুধ ঠিকমত খেয়ো আর ঐশীকে দেখে রেখো।
এয়ারপোর্টে আধাপাকা চুলের ভদ্রলোক মলিন মুখে তার ছেলের চলে যাওয়া দেখছেন। তানভীর কিছুদূর গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকালো।
মনে হলো সেই ভদ্রলোকের সাথে ওর মাও হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন ছেলেকে। কুয়াশার মত মিলিয়ে গেছে যে এতদূর সেই মানুষটাকে আজ বলতে ইচ্ছে করছে কত অমূল্য একটা মানুষকে সে উপহার হিসেবে দিয়ে গেছে। জীবনের এমনই অমূল্যের সন্ধান মেলে শেষবেলায়,সন্ধ্যে নামার আগে।
Tuffahul Jannat Maria
তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া
শিক্ষক,সাবেক শিক্ষার্থী:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়