শনিবার, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৮ মে ২০২৫, ৩:৩৪ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংকট ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ: জবাবদিহিমূলক সংস্কারের সময় এখন

আপডেট টাইম : মে ১৮, ২০২৫ ৩:৩৪ অপরাহ্ণ



শেয়ার করুন

জি. এম. রাবিউল ইসলাম: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত গত কয়েক দশকে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও গুণগত মান নিয়ে চলছে নানা প্রশ্ন। নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দক্ষতার অভাবসহ নানাবিধ কাঠামোগত সংকট শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থবির করে রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটেরই ইঙ্গিতবাহী।

শিক্ষার্থীরা বারবার তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর সমাধান আসছে না। মৌখিক আশ্বাস, সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অদূরদর্শিতার ফলেই শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন জন্ম নিয়েছে।

বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অব্যবস্থাপনা, বাজেট ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব প্রকট। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার—যেমন মানসম্মত শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণার সুযোগ—প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এই সমস্যার একটি প্রতীকী উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীর কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আবাসন সংকট, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবের অভাব এবং শিক্ষক স্বল্পতা প্রকট। দাবিগুলো বারবার উত্থাপিত হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও অকার্যকর পদক্ষেপের কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হয়েছে।

এই সংকট শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়—দেশের অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা যায়। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। এছাড়া বাজেটের অপ্রতুলতাও সমস্যাকে তীব্র করছে।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২%-এর নিচে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম। গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনেকক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়। এর ফলে শিক্ষার মান হ্রাস পাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

এই সংকট উত্তরণে উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলেই কেবল এই সংকট কাটানো সম্ভব।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত শুধু ডিগ্রি প্রদানের কেন্দ্র নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল হাতিয়ার। এই খাতে অবহেলা ও অদূরদর্শিতার ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। তাই এখনই সময় জবাবদিহিমূলক সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই ও গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার।

লেখক: জি. এম. রাবিউল ইসলাম, পিএইচডি, অধ্যাপক, খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

শেয়ার করুন