1 January 2022, 5:06 PM
গোলজার আহমদ হেলাল :অপহরণের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও উদ্ধার হয়নি উজ্জ্বল। ১৪ বছর বয়সী উজ্জ্বল ২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট সিলেট নগরীর কাজীটুলা থেকে অপহৃত হয়। প্রভাবশালী সরকারী কর্মকর্তা উজ্জ্বলের বোনের জামাই মুজিবর রহমান পাটোয়ারী ও কাজীটুলা এলাকার নরপিশাচ কালিয়ারা মিলে উজ্জ্বলকে অপহরণ করেছে বলে জানা যায়। অভিযুক্ত মুজিবর রহমান পাটোয়ারী ও কালিয়ারা ভিকটিম উজ্জ্বলকে গোপনভাবে ও অবৈধভাবে অবরোধ করার উদ্দেশ্যে অপহরণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়।উজ্জ্বল অপহরণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি এখন স্থগিত রয়েছে।অভিযুক্ত আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে,
উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় দিনযাপন করছেন উজ্জ্বলের বাবা নজির আলী ও তার পরিবার।
অপহরণের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও উজ্জ্বলকে না পাওয়ায় ভিকটিমের পরিবার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় দিনযাপন করছেন। সেই পরিরবারের প্রতিটি সদস্য শোকে মুহ্যমান। ভাইহারা বোন, ভাইহারা ভাই, ছেলে হারা মা ও বাবা একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়েছেন।উজ্জ্বলকে না পাওয়ার বেদনা তাদেরকে প্রতিনিয়ত পীড়া দিচ্ছে। উজ্জ্বলকে উদ্ধারের জন্য যে মামলাটি করা হয়েছিল সেই মামলাটিও প্রভাবশালী আসামী মুজিবর রহমান পাটোয়ারীর ক্রিমিনাল আপীল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য উচ্চ আদালতে স্থগিত হয়েছে বিগত ২০১৫ সালের ৪ মে। সেই থেকেই নিম্ন আদালতে উক্ত মামলার বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ আছে।
জানা যায়, পুত্রকে অপহরণের ঘটনায় নগরীর কাজীটুলা লোহারপাড়া এলাকার বাসিন্দা নজির আলী ২০০৮ সালের ৬ অক্টোবর সিলেটের চীফ জুডিশীয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় নজির আলী অভিযোগ করেন, ৩ বছর যাবত তিনি লোহারপাড়া এলাকায় বসবাস করছেন। তার প্রতিবেশী হিরণ বাবুর্চির পুত্র কালিয়ারার সাথে তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে উজ্জ্বল এর ১৮/০৮/২০০৮ ইং তারিখে কথা কাটাকাটি হয়। উক্ত ঘটনার জের ধরে মীমাংসার কথা বলে পরদিন ১৯/০৮/২০০৮ ইং তারিখে আসামী কালিয়ারা অপহৃত উজ্জ্বলকে মোবাইল ফোনে কাজীটুলা মসজিদ মার্কেটে আসামীর রেস্টুরেন্টে ডেকে নেন। সরল বিশ্বাসে বালক উজ্জ্বল তার মাকে বলে সেখানে যায়। এরপর থেকে অদ্যাবধি উজ্জ্বল আর বাসায় ফিরে আসে নি।
নজির আলী পুত্রকে সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজে না পেয়ে তার মেয়ে মোছা: রোজিনা বেগম কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করেন। যার নম্বর ১৮৪০,তাং ২৫/০৮/২০০৮ ইং। পরবর্তী তে আরো খোঁজাখোজি করে ছেলের কোন সন্ধান না পাইলে কোতোয়ালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন অপহৃত উজ্জ্বলের বাবা নজির আলী। কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ দাখিলকৃত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোন মামলা রুজু করেননি। এদিকে এলাকার কমিশনার সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণের সামনে তার পুত্রকে ডেকে নেওয়ার কথা অভিযুক্ত কালিয়ারা স্বীকার করলেও উজ্জ্বলকে কোথায় নিয়ে গেছে অথবা সে বর্তমানে কোথায় আছে এ ব্যাপারে অভিযুক্ত কালিয়ারা কোন সদুত্তর দিতে পারে নি,সে সুষ্পষ্টভাবে কিছু বলে নাই। উল্টো অভিযুক্ত কালিয়ারার কথাবার্তায় সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। অভিযোগে নজির আলী আশংকা করেন, সন্ত্রাসীরা তার ছেলেকে খুন করিয়া অজ্ঞাত স্থানে লাশ গুম করিয়া রাখিয়াছে। তাই নিরূপায় হয়ে তিনি সিলেটের চীফ জুডিশীয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ৬৯২/০৮,তাং ০৬/১০/২০০৮ ইং। আদালতের নির্দেশে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দরখাস্ত মামলাটি এজহার হিসেবে গণ্য করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠলে পরবর্তীতে আদালত বিচারবিভাগীয় তদন্তের জন্য সিলেটের জুডিশীয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন কবিরকে নির্দেশ দেন। বিচারবিভাগীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা বিগত ০১/০৬/২০১১ ইং তারিখে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন বিচারিক আদালতে দাখিল করেন। উক্ত প্রতিবেদনে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে উল্লেখ আছে।এতে আসামী কালিয়ারা ও আসামী মুজিবর রহমান পাটোয়ারীকে মামলায় দণ্ডবিধির ৩৬৫ ধারায় অভিযুক্ত করা যেতে পারে উল্লেখ করা হয়। বিচারবিভাগীয় তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে সাক্ষীরা বলেছেন, ভিকটিম উজ্জ্বল কে আসামী মুজিবর রহমান পাটোয়ারী আটক রেখেছে। উজ্জ্বল এর বোন কর্তৃক মজিবর রহমান পাটোয়ারীর উপর দায়েরকৃত মামলা উঠিয়ে না নিলে আসামীরা উজ্জ্বলকে ফেরত দিবে না।
অসহায় নজির আলী এক সময় ছাতক পেপার মিলে কাজ করতেন। পেপার মিল বন্ধ হয়ে গেলে তিনি কর্মহীন হয়ে যান। তার বড় মেয়ে রোজিনা বেগম চাকুরীর সন্ধান করতে থাকলে একসময় পরিচয় হয় সিলেট সদরের তৎকালীন সাব রেজিস্টার রংপুর জেলা শহরের ধাপকটকি পাড়ার মৃত নজব উদ্দিন পাটোয়ারীর ছেলে মো: মজিবর রহমান পাটোয়ারীর সাথে। সুচতুর নারীলোভী মজিবর রহমান পাটোয়ারী যুবতী রোজিনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং রোজিনার ছোট বোন পান্না কে চাকুরি দেয়ার কথা বলে।সে ফাঁদে রোজিনা ও তার পরিবার পড়ে যায়। ফলে কোন প্রকার কাবিন রেজিস্টারি ছাড়াই বিগত ১৪/০৮/০৭ ইং তারিখে পারিবারিক ভাবে মুজিবর রহমান পাটোয়ারীর সাথে রোজিনার বিয়ে হয়। বিয়ের পর অভিযুক্ত মজিবর রহমান পাটোয়ারী রোজিনাকে নিয়ে তার নগরীর মিরাবাজারে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে ২৮/১১/০৭ ইং তারিখে অভিযুক্ত মুজিবর রহমান পাটোয়ারী ঢাকায় বদলী হন। দ্বিতীয় স্ত্রী রোজিনাকে ঢাকায় নিয়ে যান। সিলেটে ও ঢাকায় থাকতে রোজিনা কাবিন রেজিস্টারি করার কথা বললে অভিযুক্ত পাটোয়ারী ক্ষিপ্ত হয়ে রোজিনাকে মারধর করতেন ও হুমকী দিতেন। ঢাকার বাসায় কাজের মেয়ের সাথে অনৈতিক কাজ ও ভাতিজি পরিচয় দিয়ে সময়ে সময়ে বিভিন্ন যুবতী মেয়েদের সাথে অবৈধ মেলামেশায় রোজিনা বাধা দিলে প্রায়ই তাদের মাঝে ঝগড়া হত। অনন্যোপায় হয়ে রোজিনা বিষয়টি বাড়ীর মালিককে অবহিত করলে অভিযুক্ত মজিবর রহমান পাটোয়ারী আরো ক্ষিপ্ত হয় এবং রোজিনাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এবং রোজিনার সাথে তার কোন বিয়েই হয়নি বলতে থাকে। রোজিনাকে গুন্ডা দিয়ে মেরে বুড়িগঙ্গায় লাশ ফেলার ভয়ভীতিও দেখায় অভিযুক্ত মজিবর। এঘটনার পরদিন ০২/০৩/০৮ইং তারিখে জোরপূর্বক রোজিনাকে সিলেট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের চীফ জুডিশীয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রোজিনা অভিযুক্ত মজিবর রহমান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ৯০১/২০০৮ ইং, তারিখ ০৮/০৬/০৮ ইং। অভিযুক্ত মজিবর রহমান পাটোয়ারীর উপর এ মামলা দায়েরের ২ মাস ১১দিন পর রোজিনার ভাই উজ্জ্বল অপহৃত হয়।
এঘটনায় অপহৃত উজ্জ্বলের বাবা ও মামলার বাদী নজির আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, মামলা হাইকোর্ট স্টে করেছেন। আমি অসহায় গরীব মানুষ। কোন আইনী পদক্ষেপ নিতে পারছি না। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে আমরা ন্যায়বিচার পাব। তিনি বলেছেন, আজ ১৩ বছর হল। ছেলে উদ্ধার হয়নি। অভিযুক্তরা দোষী প্রমাণ হলে শাস্তি পাবে ঠিকই। কিন্তু আমার ছেলে তো অপহরণ হয়েছে। আমার ছেলেকে কি পাবো না? আমি প্রশাসন ও সরকারের কাছে আমার ছেলেকে উদ্ধার করতে আকুল আবেদন করছি।