,

25 June 2026, 5:01 PM

কিংবদন্তি জেলা প্রশাসক “ডিসি সারওয়ার “:লড়েছেন স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে

আপডেট টাইম : June 25, 2026 5:01 PM



শেয়ার করুন

কিংবদন্তি জেলা প্রশাসক “ডিসি সারওয়ার “
চব্বিশের ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী সিলেটের ডিসি মুরাদ ও ডিসি সারওয়ার লড়েছেন স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে
ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায়ে কুঠারাঘাত করেছেন জনপ্রশাসনের এই দুই কর্মকর্তা
দুষ্ট লোকের যম ছিলেন ডিসি সারওয়ার। সারওয়ার’রা মরে না।সারওয়ার’রা অমর হয়
ডিসি সারওয়ারও কি ডিসি মুরাদের মতো বলির পাঁঠা?জনমনে নানা প্রশ্ন!

গোলজার আহমদ হেলাল, সিলেট :
ডিসি সারওয়ার কে দেশ-বিদেশের সকলেই চিনেন।সিলেটে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগ থেকেই তিনি ছিলেন ভাইরাল।র্যাবের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অনেক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছন অনেক আগেই।সিলেট আগমনে সাধারণ মানুষ তাঁকে উৎফুল্ল হয়ে স্বাগত জানায় ও বরণ করে ফুল দিয়ে। বিদায়বেলায় ও তিনি বীরের মতো প্রস্থান করেছেন।মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন। একজন সরকারী কর্মকর্তার বিদায়ের প্রাক্কালে সাধারণ মানুষ দাবী জানায় স্বপদে বহাল রাখতে।রাজপথে মিছিল সমাবেশ হয়,মানুষ কাঁদছে তাঁর জন্য।এটি চাট্টিখানি কথা নয়।একজন জনপ্রিয়, জনবান্ধব ও সাহসী জেলা প্রশাসক সিলেট হারালো। এটিই সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তি। আরো কিছু সময় পেলে সিলেট অনেক দুর এগিয়ে যেত।এটি ছিল গণমানুষের প্রত্যাশা।

সদাশয় সরকার অসময়ে অন্যায় আদেশের মাধ্যমে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ জেলা প্রশাসক সারওয়ার কে ত্বরিত গতিতে সরিয়ে ফেলল কর্মস্থল থেকে।মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হলো।এবং সেই সাথে আশংকা তৈরি হলো,সিলেট কি থমকে দাঁড়াবে।ডিসি সারওয়ার এর বদলী স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক সেটি প্রশ্নবিদ্ধ এক আলোচনা ,কিন্তু স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট এখানে জড়িত থাকার সন্দেহকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ডিসি বদল সমস্যা নয়,সমস্যা সিন্ডিকেট। এর আগে ঐ সিন্ডিকেট ডিসি মুরাদকেও বলির পাঁঠা বানিয়েছিল।ডিসি কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বানিয়ে রমরমা লুটপাট বাণিজ্যে বুলডোজার হামলা করেছিলেন ডিসি মুরাদ।ঠিক তদ্রূপ মদ,গাঁজা,সন্ত্রাস ও বিনাপূঁজির কোটি টাকার বাণিজ্যে সজোরে মেশিনগান ছুঁড়েছেন ডিসি সারওয়ার। এটা অনেকের গাঁয়ে লেগেছে।

ডিসি সারওয়ার বাংলাদেশে একজনই।বহু বছর আগে সোলাইমান নামে এক ডিসি ছিলেন।তিনি ফেনী থেকে জ্বিন ভূত তাড়িয়েছিলেন।ডিসি সারওয়ার এক কিংবদন্তি জেলা প্রশাসক।যাকে নিয়ে মানুষ মিছিল করছে,সমাবেশ করছে,রাজপথে মানববন্ধন করছে।ইতোমধ্যে প্রবন্ধ, কবিতা,গান,গল্প রচিত হয়েছে। নাটক কিংবা উপন্যাস, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারিও হবে।কারণ তাঁর কর্মযজ্ঞ অনেক।অসাধু ও অসৎচরিত্রের লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধাচারণ করে ব্যাঙ্গচিত্রও তৈরী করছে।সমাজে যারা ভাইব্রান্ট হয়,তাদের কিছু বিরোধিতাও হয়।জেলা প্রশাসকের চেয়ারে বসে কোরআনের কথা বলা, অনিয়ম,অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হয়ত বা কেউ ভালো চোখে দেখেনি।দুষ্ট লোকের যম ছিলেন ডিসি সারওয়ার। সারওয়ার’রা মরে না।সারওয়ার’রা অমর হয় এভাবে।

সিলেটে এসে ডিসি সারওয়ার বলেছিলেন,তিনদিন থাকি আর যতদিন থাকি সবাইকে দৌড়ের উপর রাখব।সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, মাস শেষে সরকারের কাছ থেকে বেতন নিবেন।আর অফিসে বসে বসে সময় কাটাবেন,তা হবে না।কাজ করতে হবে।তিনি তা করার চেষ্টা করেছেন।তিনি শিক্ষার উপর অনেক জোর দিয়েছিলেন।তিনি প্রায়ই বলতেন,রাস্তাঘাট এইগুলো ঠিক করা যায়, বার বার কাজ হবে।কিন্তু একজন আলোকিত মানুষ তৈরী হলে সমাজ ও জনপদ আলোকিত হবে।আমরা সবাই ছেলে সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানানোর কথা বলি।কিন্তু আমরা আদর্শ মানুষ তৈরীর কথা বলি না।তিনি সিলেটে যতগুলো কাজে হাত দিয়েছেন।সবগুলো ছিল চ্যালেঞ্জিং।এবং স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলেই কাজ শুরু করেন।এটাই তার বড় সফলতা।

জেলায় ডিসি হলেন রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিনিধি। সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরগুলের সমন্বয় সাধন করে সরকারের সকল নির্দেশনা মেনে বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।তিনি একাধারে জেলা প্রশাসক,জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কালেক্টর। তিনি জেলার উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দেখভাল করেন এবং স্থানীয় সরকারের তদারকি করেন।মোট কথা ডিসি জেলার সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ সরাসরি জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে।জেলা প্রশাসক চাইলেই জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন।

ব্রিটিশ আমলে দখলদার ইংরেজরা লাটিয়াল বাহিনী হিসেবে জেলা কালেক্টর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশকে ব্যবহার করত।জেলা কালেক্টরকে দিয়ে খাজনা আদায় করানো হত,পরবর্তীতে তাকে প্রশাসনিক ক্ষমতা, ম্যাজিস্ট্রেসী পাওয়ার দেয়া হয়।কালক্রমে জেলা কালেক্টর পদটি জেলা প্রশাসকে পরিণত হয়।ব্রিটিশরা চলে গেল,পাকিস্তান পরাজিত হল,গণতন্ত্র বিকশিত হলো।এই দীর্ঘ যাত্রায় জেলা প্রশাসকের পদটি জনগণের সেবামূলক পদে পরিণত হতে লাগলো।তবে সরকার প্রায়ই লাটিয়াল হিসেবে পেতে চায় এই পদে আসীন কর্মকর্তাদের।কমান্ডিং পোস্টগুলোও অনেক সময় আশীর্বাদপুষ্ট হয়।কিন্তু,সৎ,নির্ভীক,দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব জেলা প্রশাসকগণ জনগণের হয়ে কাজ করতে চান।তারা আইনগতভাবে রাষ্ট্রের কার্যাদি সম্পন্ন করতে চান।এখানেই বাঁধ সাধে। রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও আইনগত এখতিয়ারে সমঝোতা না হলে টানাপোড়ন,সংকট সৃষ্টি হয়।তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কথা বলে ক্ষমতা প্রাপ্ত কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদে সরিয়ে দেয়া হয়। মুলত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এটি একটি পরিভাষা। প্রকৃতপক্ষে পদোন্নতি ব্যাতিরেকে সকল বদলিই রহস্যঘেরা।রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার স্বার্থে বলা হয় না।এটি আসলে অন্যায় ও জনস্বার্থ পরিপন্থী। অথচ এটিকেই জনস্বার্থে চালিয়ে দেয়া হয়।আমাদের দেশে এটিই প্রবলেম। ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই।আইন বইয়ে এফআইআর এর যে সহজ সংজ্ঞা আর বাস্তবে ওসি’র দরজায় মানুষের বিড়ম্বনা ও হয়রানি রীতিমতো ত্রাহি ত্রাহি।

ডিসি সারওয়ার অনেক কাজ করেছেন।এর আগের ডিসি মুরাদও অনেক কাজ করেছেন। দুইজনকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে কার স্বার্থে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী উভয়েই।দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ।গেল রমজানে ডিসি সারওয়ার আলম সহ প্রথমদিন আমরা একসাথে এতিমদের সাথে ইফতার করেছি।তিনি বললেন,আজ প্রথম ইফতার। কিন্তু নিজেদের স্ত্রী সন্তান ছেড়ে এখানে এসেছি মানবতা ও দেশপ্রেমের জন্য।ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমার ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবনে কখনো মা’কে ছাড়া ঈদ করিনি।সিলেটে দুটি ঈদ-ই মা ছাড়া করলাম।তাদেরও ব্যাক্তিগত জীবন আছে।পরিবার আছে।কিন্তু,উনারা রীতিমতো এমন এমন কাজ করতেন, সাহস ও সততা না থাকলে তা হত না।ডিসি মুরাদ ক্ষমতাধর, তদবিরবাজ ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীদের প্রকাশ্যেই বলেছেন,অনিয়ম ও আইনবহির্ভূত কিছু করতে আমাকে আগে ঢাকা পাঠিয়ে দেন।আমি জেলা প্রশাসকের চেয়ারে বসে থাকব,এগুলো হবে।তা হতে দেব না।ডিসি মো: সারওয়ার আলম প্রকাশ্যে সভায় বলতেন, দুর্নীতি আমি নিজে করব না।অন্য কাউকেও করতে দেব না।এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স।সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন,১০ কোটি নয়, ১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েও সারওয়ারকে কেউ কিনতে পারবে না।১টাকা দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে চাকরি ছেড়ে দেব।যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।যোগদানের পরপরই তিনি নিজের আত্মীয়স্বজনকেও জেলা প্রশাসকের বাসভবনে যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ফুটপাত হকারমুক্ত, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, বিল-জলমহাল শাখার বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান, জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জের ‘সাদা পাথর’ এলাকা থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেন। ডিসি সারওয়ার আলম জাফলং এলাকার শতাধিক অবৈধ ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।স্বাস্থ্য খাতের শুদ্ধি অভিযান,সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দালাল সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে,রেলওয়ের কালোবাজারি রোধে কঠোর অভিযান চালান এবং ওসমানী মেডিকেলে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল চালুর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন।সরকারি জমি উদ্ধার, প্রভাবশালী মহলের জবরদখলকৃত শত শত একর সরকারি খাস জমি তিনি উদ্ধার করেন। ভূমিসেবাকে আরো জনবান্ধব করে গড়ে তুলেন।প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ৩ হাজার বিঘা জমিতে একটি আধুনিক ‘প্রবাসী পল্লী’ গড়ে তোলার দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। নগরীর ২৬টি বা তার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।তিনি ইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাষ্ট, কৃষক কল্যাণ ট্রাষ্ট ও শিক্ষক কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন করেন।প্রবাসীদের এই প্রথম বাংলাদেশে তিনি সিলেট থেকে এওয়ার্ড প্রদান শুরু করেন।২০লাখ বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি হাতে নেন ইত্যাদি। সরকারী বিভিন্ন ইভেন্টে সিলেটকে প্রথম সারির পর্যায়ে নিয়ে আসেন।বিমানবন্দর আধুনিকায়ন ও সিলেটকে ইউনিক পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে কাজ করেন।

ডিসি সারওয়ার আলমের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।গত শুক্রবার(১২ জুন) সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর দরগা পরিদর্শন করেন।

এসময় সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন,“হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজার শুধু সিলেট অঞ্চলের নয়,সারা বাংলাদেশের একটি নেয়ামত ও গর্ব এটি।এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে:মাজার,মসজিদ ও মাদরাসা।তিনটির সমন্বয়ে ইসলামী কমপ্লেক্স হোক।মাদ্রাসাটি হোক ভাল মানের মাদ্রাসা,দ্বিতীয় দেওবন্দের মতো হোক।মসজিদ হোক স্থাপত্যকীর্তি ও নান্দনিক।আগন্তুকরা যেন এসে ভালভাবে নামাজ পড়তে পারে।মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা হবে আমল ও এলেমে জগত ইশারা।”

জেলা প্রশাসক আরো বলেন,মাজারটি হোক অত্যাধুনিক,নান্দনিক। ভক্তরা যেন এসে পায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।তিনি বলেন,প্রকৃত অর্থে এটি এমন হোক যে কারণে হযরত শাহজালাল এখানে এসেছিলেন, ইসলামের আলো প্রচার ও প্রসারের জন্য সেটি তেমনই হোক।

এসময় মাজারের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে জেলা প্রশাসক বলেন,এটির একটি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।জেলা প্রশাসক জানান,সরকার ৩০কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজালাল মাজারে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছে।মাজারের আধুনিকায়নে সরকার কাজ শুরু করেছে।৩০ কোটির মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২৫ কোটি,মাজার কর্তৃপক্ষ দিবে ৫ কোটি।তারা তা দিতে পারছে না।অপরদিকে মাজারের ৫ কোটির মধ্যে সিটি করপোরেশন দিচ্ছে ৩ কোটি।এরপরও বাকী ২ কোটি মাজার কর্তৃপক্ষ দিতে সক্ষম হচ্ছে না।বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে।প্লানিং কমিশন থেকে মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসেব দেখতে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি।

মাজার থেকে বিভিন্ন অনিয়ম দূরীকরণ করতে হাত দিলেন।মাজারে ভিক্ষুকদের কাছ থেকে চাঁদা,সাধারণ মানুষকে হয়রানী,খাদিম চক্রের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা ও দখল বাণিজ্য রোধ করতে ডিসি সারওয়ার পদক্ষেপ নেন।মাজার নিয়ে একাধিক সভা করেছেন।কারো অগোচরে কিংবা আদিষ্ট হয়ে তিনি কোন কিছু করেননি।উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র।
ডিসি সারওয়ার শাহপরান মাজারও পরিদর্শন করেন।মসজিদে নামাজ আদায় করেন।জুমার নামাজের আগে ভাষণও দেন।মাজারের অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে তিনি বলেন, “সবকিছু সরকারের ওপর চাপাবেন, আর নিজেরা উন্নয়ন করবেন না—তা হবে না। সমাজকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।”ডিসি আরও বলেন, শুধু অভিযান নয়,মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।এ সময় শাহপরান (রহ.) মাজার এলাকায় উপস্থিত সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবস্থার দাবি জানান।

জেলা প্রশাসক শাহজালাল মাজার কর্তৃপক্ষ, মসজিদ কমিটি,মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষে,ইমাম সমিতি,ওয়াকফ প্রশাসন,বিএনপি নেতৃবৃন্দ সহ একাধিকবার সভা করেন।সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটি আহবায়ক কমিটি গঠন হয় ও পরবর্তীতে দরগাহ মাজারে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় ও পুরনো ঐতিহাসিক ডেগগুলো সিলগালা করা হয়।শাহজালাল মাজারের দানবাক্স স্থাপন,আলোচনা, পরেরদিন শাহপরান মাজার পরিদর্শন, মদ,জুয়া,গাঁজা বন্ধের কড়া নির্দেশ, মাজারের জায়গা দখল নিয়ে লাউড এন্ড ক্লিয়ার হুঁশিয়ারি ইত্যাদির মধ্যেই ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহারের সার্কুলার আসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে।

বিদায়ের প্রাক্কালে শাহজালাল (রহ.) মাজারে প্রথমবার প্রকাশ্যে দানবাক্সের টাকা গণনা,৭০০ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ডিসি সারওয়ার।আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি হল।সিলেট জেলা প্রশাসন এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণের উপস্থিতিতে দান বাক্সের টাকা গণণা হলো,ব্যাংকে টাকা জমা করা হলো।এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।এ যেন বীরের মতো সিলেট থেকে প্রস্থান করলেন ডিসি সারওয়ার।শাহজালাল মাজারে প্রকাশ্য গণণায় দান বাক্সে পাওয়া গেল ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা(তিন দিনের হিসাব) এবং ৭ আনা স্বর্ণ,দুটি সৌদি রিয়াল।তিনি(ডিসি সারওয়ার) জেলা প্রশাসকের তহবিল থেকে দান করলেন আরো ৫ লক্ষ টাকা।

ডিসি সারওয়ার এর বদলিতে সিলেটবাসী খুবই মর্মাহত এবং একই সাথে বিস্মিত।সিলেটবাসী আজীবন মনে রাখবে তাঁকে। আরো কিছুদিন থাকলে সিলেটের সামগ্রিক উন্নয়ন অনেক এগিয়ে যেত।পাল্টে যেত সিলেটের রূপ। তিনি হতেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট অথবা হ্যামিলিওনেের বাঁশিওয়ালা। সিলেটের জনগণ তথা সিলেটবাসীর উন্নয়নে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।যেটি আমরা স্বচক্ষে দেখছি।

ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) ১৮৯৮-এর ১০ ধারা অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। সরকার প্রতিটি জেলায় একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে, যিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (District Magistrate) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সরকার প্রয়োজনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনস্থ যেকোনো প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।কোনো কারণে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পদ শূন্য হলে, সরকার জেলায় কর্মরত অন্য কোনো প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটকে সাময়িকভাবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে।

জেলা প্রশাসক (Deputy Commissioner), জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (District Magistrate) ও জেলা কালেক্টর (Collector) মূলত একই ব্যক্তির তিনটি ভিন্ন প্রশাসনিক ভূমিকা ও দায়িত্ব। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই পদগুলোতে নিযুক্ত হয়ে থাকেন।তিনি যখন জেলা প্রশাসক (Deputy Commissioner – DC) তখন তিনি জেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয় করা তার প্রধান কাজ।বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের তদারকি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা) কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের সাধারণ নীতি ও প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন করা।

তিনি যখন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (District Magistrate) তখন জেলার প্রধান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জেলার সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা (Law and order) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপরাধ দমনে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া।তিনি যখন জেলা কালেক্টর (Collector) তখন জেলার রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান।সরকারের ভূমি রাজস্ব বা কর আদায় করা, খাস জমি ও অন্যান্য সরকারি সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, ভূমি রেকর্ড রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সরকারি ফি ও বকেয়া আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা।অর্থাৎ, জেলা প্রশাসক হিসেবে সমগ্র জেলার উন্নয়ন ও সমন্বয় করেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কালেক্টর হিসেবে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন।এই প্রভূত ক্ষমতা দিয়েই ডিসিদের নিযুক্ত করা হয়।

আইনগতভাবে একজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) কোনো কারণে বদলি, অবসর, ছুটি বা পদ শূন্য হলে নতুন জেলা প্রশাসক যোগদান না করা পর্যন্ত সরকারের প্রচলিত প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকার কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এটি প্রশাসনের স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম বদলি হওয়ার পর নতুন জেলা প্রশাসক যোগদান না করা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এডিএম পিংকি সাহার দায়িত্ব পালন করাও একই প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অংশ। এখানে ব্যক্তিগত বা বিতর্কের কোনো বিষয় নেই। বরং এটি সরকারের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

তবে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের আকস্মিক প্রত্যাহার আদেশ এবং শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান বাক্স স্থাপন ও ডেগ সিলগালা করার ঘটনাটি টক অব দ্যা কান্ট্রি। সাধারণ মানুষ ডিসির এই পদক্ষেপকে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে সাহসী লড়াই হিশেবে দেখছেন।আর ভোটের রাজনীতির কারিগররা দেখছেন ইস্যুটি স্পর্শকাতর।তাহলে সচেতন মহলের প্রশ্ন সরকারের এমন নির্দেশনা কোথা থেকে আসে?জেনে রাখা ভালো, অনিয়ম,দুর্নীতি আর অস্বচ্ছতা কখনো ট্রেডিশন(ঐতিহ্য) হতে পারে না।

শেয়ার করুন