23 January 2025, 8:48 PM
দেবাশীষ মন্ডল, কলকাতা(পশ্চিমবঙ্গ) থেকে:
প্রয়াত লেখিকা ও সমাজকর্মী তহমিনা খাতুনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠান
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবরডাঙ্গা গবেষণা পরিষদের আয়োজনে বৃহস্পতিবার বিকাল চারটে নাগাদ শুরু হয়। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক বিভিন্ন পেশায় যুক্ত মানুষজন স্মরণ সভায় আসেন।
তাঁর প্রতীক্ষিত বাঙালি নারী, চেনা মুখ, অচেনা মানুষ, মায়ের ভাষা, বন্যা ২০০০, স্বপ্নের ভাঙ্গা পাঁচিল, একুশে, একাধিক বই সাধারণ মানুষের কাছে নজর কেড়েছে।তহমিনা খাতুন একদিকে যেমন ছিলেন সমাজসেবী, তেমনি ছিলেন প্রতিবাদী মানুষ।অসহায় নিপীড়িত মানুষের হয়ে কলম ধরেছেন। আজ তাঁর একটি নতুন বই উদ্বোধন হয়, স্বপ্নের ভাঙ্গা পাঁচিল। তাঁর লেখার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে জাগ্রত করেছেন। তাঁর স্বামী সাংবাদিক সুকুমার বাবু।
আগামী কাল প্রত্যুষে- সূর্য দেখা দেবে আরও একটা- নতুন দিন নিয়ে — এটাই মহাকাশের অমোঘ সত্য। কিন্তু মহাবিশ্বের প্রান্তরে পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া- মানুষেরা আর কোনদিন ফেরে না…। ফিরবে না তহমীনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বার্থে তাঁর দান করা দেহখানিকে ভবিষ্যতের চিকিৎসক মানুষেরা ব্যবচ্ছেদ করে ফেলেছেন।জানতে ভারী- ইচ্ছে হয় তাঁরা কী তহমীনার শিরদাঁড়াটাকে অন্যরকম অনুভব করেছেন!
মনে পড়ে রবি ঠাকুরকে “রাত্রি দিল ধুক ধুক/ তরঙ্গিত দুঃখ সুখ/ থামিবার বুকে/ যত কিছু ভালো মন্দ/ হত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিছু আর নাই/বিশ্বের আলোক যত/ দিগবিদিগে অবিরত/ যাইতেছে বয়ে/ শুধু ওই আঁখি পরে/ নামে- তাহা- স্নেহ ভরে/ অন্ধকার হয়ে”
দিনটা ছিল ২৩ জানুয়ারি ২০২৪। বন্ধু কবি সাংবাদিক বিপ্রতীপের আয়োজনে এক মিলন মেলায় গিয়েছিলাম আমরা সবাই মিলে সূর্যপুরে। আচমকা অপ্রত্যাশিত সংবাদ এলো দেবলের ফোনে শেষ মধ্যাহ্নে, তহমীনা আর নেই। সেই আনন্দের দিনে আমরা বিষাদে ডুবে গেলাম। বিপ্রতীপকে কিছু জানানো হয়নি। ও তখন ছোট বড়ো সকলকে নিয়ে ওই বিশাল কর্মকান্ডে ব্যস্ত। বাড়ির পথে পা বাড়ালাম ভাঙা মন নিয়ে।
“… অসীম নিস্তব্ধ দেশে / চিররাত্রি পেয়েছে সে — অনন্ত সান্ত্বনা।” পরিণত বয়সের তহমীনার সঙ্গে আমার কোনদিন দেখা হয়নি। কিশোরীবেলায় মাত্র কয়েকঘন্টা আলাপেই আমার ওকে চেনা। সেই প্রথম ও শেষ দেখা।
“বয়স তখন ছিল কাঁচা/ হালকা দেহখানা ছিল পাখির মত / শুধু ছিলনা তার ডানা”
পরবর্তী জীবনে তহমীনা ওজনদার মস্ত ডানা মেলে যে উড়ান দিয়েছে। তাঁর প্রতিবাদী যুক্তিবাদী না-ধার্মিক মনোভাব অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা রেখে দৃপ্ত বলিষ্ঠ জীবনের কথা জেনেছি দূর থেকে। জেনেছি মহাশ্বেতা দেবী, নবনীতা দেব সেনের লেখায়। সংবাদপত্রের শিরোনামে এসেছে সেই কিশোরীবেলায় দেখা মেয়েটি।
মুক্ত প্রকৃতির বুকে মেয়ে মানুষ জন্মাবধি এক বন্দী প্রজাতি। তাঁর হাতে পায়ে চোখে মুখে সর্বাঙ্গে সব ইন্দ্রিয়েই যেন শিকল, চিন্তা চেতনা মননেও শিকল। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, লোভ, লালসা, আকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, কুটিলতা এক এক কিসিমের শিকল, জবরদস্ত শিকল। ও পেয়েছিল এক মুক্তমনা পরিবারের উত্তরাধিকার। তাই নিজের মেধা মনন তীক্ষ্ণ যুক্তিবোধের জোরে অঙ্গ থেকে সমস্ত শিকল লহমায় ছিঁড়তে পেরেছিল। আমরা এবং আমাদের চারপাশে থাকা উচ্চশিক্ষিত – অল্পশিক্ষিত মেয়েদের কল্পনার বাইরে ওর জীবন ও যাপন।
আজকের এই মহা অন্ধকারময় নিকষ কালো তামস সময়ে হাতে গোনা যে কজন তাঁদের মেধাবী মননের আঘ্রাণ সারস্বত বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে ধর্মমোহমুক্ত বিশ্ব মানব মনের আঙিনায় নিজেকে মেলে সুগন্ধ বিস্তার করে চলেছেন তাঁদেরই মধ্যে অন্যতমা তহমীনা।
এবারে একটু পিছনে ফিরি সালটা ১৯৮২ অথবা ৮৩, বাবার সঙ্গে আমরা দুই বোনে দেখতে গিয়েছিলাম হাড়োয়ায় বালান্দা মহাবিহার। দিদির ইতিহাসে আগ্রহ ছিল অনেকটা বেশি। আমার পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসে খানিক ভীতি ছিল। বিশিষ্ট সমাজকর্মী স্বাধীনতা সংগ্রামী কৃষক আন্দোলনের লড়াকু যোদ্ধা মানবতাবাদী এম এ জব্বার আর বালান্দা মহাবিহারের গল্প শোনা ছিল বাবার কাছে। বাবা চিনতেন ওনাকে। আমার বাবা ছিলেন ঢাকা অনুশীলন সমিতির সদস্য ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে ব্রিটিশ কারাগারে বন্দী জীবন কাটানো মানুষ। দেশভাগের পর এদেশে অঙ্গে অনুশীলন সমিতির জন্যেই জব্বারবাবুকে চেনা ও বালান্দায় যাওয়া। সেবারে আমাদের নিয়ে যাওয়া। জব্বার কাকা তখন প্রায় চোখে দেখেন না। আমাদের সঙ্গী হল তাঁর কন্যাসমা রথে (তহমীনা)। ঝকঝকে এক কিশোরী _ ইতিহাসের প্রতি কী গভীর মমতা, অবাক বিস্ময়ে দেখেছিলাম মেয়েটিকে। প্রায় আমারই বয়সী কিন্তু অবাক করা অন্যরকম। কত কথা হয়েছিল সেদিনে তহমীনার সাথে। ওই বয়সেই কত প্রাজ্ঞ। প্রথম দেখাতেই ওকে বড়ো ভালো লেগেছিল। ফিরে কদিন ধরে বন্ধুদের কাছে ওই মেয়েটির গল্প করেছি। তখন কিশোর কিশোরীদের মতো আমাদের হাতে ফোন ক্যামেরা তো থাকত না, থাকলে সেই ছবি আমার ঝুলির সম্পদ হত। আবার বালান্দা যাব কথা দিয়ে এসেছিলাম ওই কিশোরী তহমীনাকে। যাওয়া হয়নি।
নব্বইয়ের দশকে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গী হই। তহমীনা তখন স্মৃতিতে মলিন। হঠাৎ করে ১৯৯৩ সালে খবরের শিরোনামে তহমীনা। ধর্ম মানতে না চাওয়া তহমীনা। আমাদের ছাপোষা মেয়েদের থেকে অনেক অনেকখানি এগিয়ে থাকা শিকল ভাঙা মেয়ে তো সে। খবরটা পড়ে বাবা বললেন, দেখতে হবে তো কোন পরিবারের ধারা ও বহন করছে!! জব্বারবাবুর ভাইঝি না? কতখানি মনের জোর– স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গী ও যুক্তিবাদী মনন থাকলে আমাদের সমাজের একটা মেয়ে ধর্মকে অস্বীকার করতে পারে? অসীম সাহসী জ্বলন্ত ডানা মেলা উন্নত শিরের এক সাহসী যোদ্ধার নাম তহমীনা। কত প্রতিকূলতা কত সমস্যার মধ্যে ওর দিনগুলো কেটেছে খবর পেতাম। আমাদের চারপাশে চেনা মেয়েদের ভীড়ে ও স্বতন্ত্র। ওর হার না মানা অদম্য সাহস আপসহীন লড়াই ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে রক্তচক্ষু সমাজের বিরুদ্ধে।
১৯৯৫ সালে গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র শিক্ষা ক্ষেত্রে ধর্মের কলামটি বিলোপ করার জন্য আন্দোলন সংগঠিত করে। সে আন্দোলনে সাথী হয়েছি। সৃজনদার (সেন)’র সঙ্গে, আমরা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশন দিতে গিয়েছিলাম। তারিখটা মনে নেই। সেই দিনে এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে নিজের কন্যাকে যখনই কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে গেছি। ধর্মের কলামকে উপেক্ষা করতে পেরেছি অনায়াসে।
২০০২ সাল তহমীনা লড়াই নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র সৃজন সেন, বঙ্কিম দত্ত, স্বপন শীল সকলে মিলে আমাদের খড়দার বাড়িতে বসেই এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। দেবল তখন গণবিজ্ঞান সমন্বয়ের সম্পাদক। কাজেই মাঝে মধ্যে মিটিংগুলো আমাদের বাড়িতে হতো। ২০০৩ সালের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশ পেল সুরেশ কুণ্ডুর লেখা সৃজনদার প্রচ্ছদে সমৃদ্ধ ‘তহমীনা রণক্ষেত্রে একা’। পুস্তিকাটি ছাপানোর কাজে আমাদের বন্ধু শক্তিব্রত দত্ত উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখনও খড়দহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অবশিষ্ট কয়েকটি পুস্তিকা সযত্নে রাখা আছে অনুজবন্ধু নীতিশ বিশ্বাসের কাছে।
জীবন সংগ্রামে মেয়েরা ধর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করার সাহস সে আজীবন দেখিয়েছে। পাশে পেয়েছিল সুকুমারদা (মিত্রর)’র মতো অসম সাহসী না-ধার্মিক মুক্তমনা এক মানুষকে। সেই বলিষ্ঠ হাতটা না পেলে তহমীনার তহমীনা হয়ে ওঠার পথটা এত মসৃণ হত কী? নিজে ছাপোষা পরাজিত একটা মেয়ে বলেই প্রশ্নটা মনে উঁকি দেয়। বিয়ের পর স্বাবলম্বী না হতে পারা মেয়েরা আজও শৃঙ্খলিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে ভেতরে যদি বা শিকল ভাঙার ইচ্ছে থাকে বা প্রতিবাদের আগুন থাকে তাকে সিংহভাগ মেয়ে টুটি চেপে মেরে ফেলতে বাধ্য হয়। সমাজটা তো পুরুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অধিকাংশ পুরুষ বিয়ে করা নারীর ইচ্ছে অনিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত করে। অধিকাংশ নারীর স্বাধীনতার স্বপ্নগুলোকে মরে যেতে দেখেছি বিবাহ প্রতিষ্ঠানের হাত ধরাতেই। সঠিক জীবন সঙ্গী নির্বাচন করাও তহমীনার জীবনের ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এগিয়ে চলার নামই তো জীবন। জীবন মানেই সুখ-দুঃখের এক বিরাট মহাকাব্য।
হাজারো পাওয়া না পাওয়া নিয়েই চলার নাম জীবন। যে মেয়েটি কারও রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি সে তো মারণব্যাধির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারল না। বড্ড অসময়ে লড়াকু তহমীনা-জীবনে প্রথমবার পরাজয় বরণ করল। যে হেরে যাওয়া থেকে উঠে দাঁড়াতে পারলনা তাঁরই নাম মৃত্যু।
শঙ্খ ঘোষের থেকে ধার করে বলি-
“… কেননা নীরব এই শরীরের চেয়ে আরো বড়ো কোন ভাষা নেই/ কেননা শরীর তার দেহহীন উত্থানে জেগে / যতদূর মুছে নিতে জানে / দীর্ঘ চরাচর / তার চেয়ে আর কোন দীর্ঘতর যবনিকা নেই/শূন্যতাই জানো শুধু?/ শূন্যের ভেতরে এত ঢেউ আছে/ সে কথা জানে না”
“চেনা মুখ অচেনা মানুষ’ বইখানি পড়ে আমি তহমীনাকে আবিষ্কার করেছি অন্যতর অনুভবে। ওঁর দৃপ্ত রঞ্জিত মুখ খুঁজে পেয়েছি নিভৃতে। মৃত্যুমুখী অনেক ফুলই জানে ঝরে পড়েও বেঁচে থাকার মানে। কী অসম্ভব অন্তর্ভেদী অনুভবী দৃপ্ত কলম!
এখন ওর সঙ্গী ঘুমের দেশ সমুদ্র কল্লোল আর মাথার ওপর জেগে থাকা অনন্ত নক্ষত্রবীথি।
মানুষের চোখে আবার আঁধার দেখি- আয়ু শেষে কেউ কেউ বাঁচে। চাই চাই বলে ছুটে চলা পৃথিবীর মানুষের ভিড়ে তহমীনা গেয়ে ওঠে গান, দিগন্ত ছুঁয়ে একলা। চলে যায় তাঁর জন্ম খোলস সংসার-ঘরবাড়ি। অক্ষয় হোক তোমার প্রিয়জন তোমার সোনার কলম। আমার বকুলতলায় আর সকালের উঠোনে তোমার কলমের আসন পাতা থাক চিরদিন। অচিনপুরের পাখি তোমার ডানাতে মন রাখি। সময় তোমার ফুরিয়ে এলো তো অসময়ে। জীবন ঘড়ির ব্যাটারি ফুরুৎ। অন্ধকার আকাশ থেকে তোমার আলো এসে পড়ে আমাদের মুখে অথচ তোমার মুখ তো আর দেখা যায় না। তোমার সাথে দেখা করতে হলে অনেক পথ হাঁটতে হবে। পড়ে আছে তোমার দাগকাটা শব্দহীন খাতা। খাতায় জাফরি কাটা রোদের মৃত ভবিষ্যৎ।
প্রয়াণ দিবসে প্রণাম তোমায় তহমীনা খাতুন। আজ তহমীনার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে আমরা মিলিত হবো গোবরডাঙ্গা রেনেসাঁ ইনস্টিটিউটে বেলা সাড়ে তিনটেয়। তহমীনা স্মারক বক্তৃতা দেবেন অধ্যাপক শোভনলাল দত্তগুপ্ত, বিষয় : ভারতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ও গণতন্ত্রের সংকট। প্রকাশিত হবে তহমীনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “স্বপ্নের ভাঙা পাঁচিল”…