,

19 January 2025, 5:49 PM

স্বৈরাচারের দোসরদের কবলে তামাবিল স্থলবন্দর

আপডেট টাইম : January 19, 2025 5:49 PM



শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক 

সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত সরকারের রাজস্ব আয়ে অন্যতম সিলেটের ব্যস্থতম তামাবিল স্থলবন্দর। এই স্থলবন্দরে দেশের সকল অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ব্যাবসা করতে আসেন। কিন্তু যেখানে কেউ শান্তিতে ব্যবসা করতে পারেননি। সর্বদাই সিন্ডিকেটে বন্দী থাকে এই স্থলবন্দর। গত ৫ আগস্টের পূর্বে তামাবিল স্থলবন্দর নিয়ন্ত্রণ করতেন জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, সারোয়ার হোসেন ছেদু, আওয়ামী লীগ নেতা জালাল উদ্দিন, সাহরব, ও বিএনপির লেবাসধারী মি. হেনরি লামিনের হাতে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তাদের যোগসাজশে স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা চলাফেরা করতেন। এছাড়া তাদের সাথে জড়িত ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান লেবু। তিনি তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপিকে সুপারিশ করে স্থলবন্দরে আওয়ামীলীগপন্থী একজন সাংবাদিককে জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে বসিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেখানে স্থানীয় গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার সাংবাদিকদের রাখার কথা থাকলেও তা করেননি সাবেক ঐ মন্ত্রী।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর বেশিরভাগ আওয়ামী লীগ নেতা পালিয়েছেন। আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু তামাবিল স্থলবন্দরের লুটপাটকারী আওয়ামী লীগ নেতারা পালায়নি। তারা সবাই আত্মগোপনে চলে যায়। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন আওয়ামীলীগ নেতা জালাল উদ্দিন।তাকে নিয়ে পদবঞ্চিত জেলা বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম শাহ পরান তামাবিল স্থলবন্দরের পাথর আমদানীকারক গ্রুপের অফিসে বৈঠক করেন। এরপর থেকে মিডিয়ার আলোচনায় আসেন আওয়ামী লীগ নেতা জালাল উদ্দিন। পরে তিনি গত ৫ আগস্টের পর একটি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতাদের সকল ব্যবসার দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতারা। এনিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়।
স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা তাদের দায়সারা দায়িত্ব পালন করছেন এমন অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এনামুল হক নামের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন ‘ তামাবিলে এখনো আওয়ামী লুটপাট চলমান। আওয়ামী লীগ নেতার একই গাড়ি দুই দিনে দুই ধরনের ওজন হয় কিভাবে। তামাবিল পোর্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এভাবেই লুটপাট চলমান। এছাড়া গত ৯ নভেম্বর স্থলবন্দরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলার কারণে একটি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় মিথানল বাহী ট্যাংকলরীতে আগুন লেগেছে। কিন্তু সেই বিষয়টি এখনো তদন্ত হয়নি। বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছেন সমন্বয়কারী মি হেনরি লামিন ও রফিকুল ইসলাম শাহপরান।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের আস্থাভাজন মি. হেনরি লামিন তামাবিল স্থলবন্দরে এখনও বেপরোয়া ভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। আওয়ামীলীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী সেই অলোচিত হেনরি লামিন এখনো বেপরোয়া। তামবিল স্থলবন্দর ও জাফলং পাথর কোয়ারী এলাকায় বিগত ১৭ বছর আওয়ামীলীগের বিএনপির লেবাসধারী হেনরি লামিনের ছিলো ত্রাসের রাজস্ব। তার কাছে পদে পদে নির্যাতিত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে ব্যবসা ছেড়ে রাস্তায় বসেছেন। পরিবার নিয়ে না খেয়ে জীবন-যাপন করছেন অনেক ব্যবসায়ী। গত ৫ আগস্টের অল্প সবকিছু পরিবর্তন হলেও হেনরি লামিনের রাজত্ব বহাল। স্বৈরাচার আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর তার বাড়িতে রেখে অনেক নেতাকে তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। বর্তমানে হেনরি লামিন বিএনপি সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে তার ত্রাসের রাজত্বে চালিয়ে যাচ্ছে। জাফলংয়ের বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা তাকে সহায়তা দিয়ে আসছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, স্থলবন্দরে পণ্য তোলা-খালস থেকে শ্রমিকদের খরচ বাবদ প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন আওয়ামীলীগের সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সরকার পতনের কয়েকদিনের মধ্যে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম শাহপরানের নেতৃত্বে তামাবিল স্থলবন্দরের অফিস দখল করে দেওয়া হয়। এরপর শুধু লিয়াকত অলী আড়ালে চলে গেছে কিন্তু বাকিরা প্রকাশ্যে বিএনপি নেতাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তামাবিল স্থলবন্দর ও জাফলং পাথর কোয়ারিতে শুরু করেন লুটপাট। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় রফিকুল ইসলাম শাহপরানের দলীয় পদ স্থগিত করা হয়। এরপর লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক মামলা করেন পরিবেশ অধিদপ্তর। মামলায় ও দলীয় পদ স্থগিত হওয়ার পর লুটপাটকারীদের থেকে দূরে সরে যান রফিকুল ইসলাম শাহ পরান। পরে জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপনের নেতৃত্বে গড়ে উঠে সিন্ডিকেট। স্বপন তার বলয়ের লোকদের নিয়েই লুটপট সিন্ডিকেটের যাত্রা শুরু করেন। এই সিন্ডিকেটে রাজত্ব বেড়েছে লেবাসধারী হেনরি লামিনের। তার বাড়ি তামাবিল স্থলবন্দরের পাশেই আলুবাগানে। সেই সুবাদে তামাবিল স্থলবন্দরে তার রাজত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীদের কাজ থেকে হেনরি লামিন ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী আব্দুস শহীদকে ফুলের তোড়া দিচ্ছেন হেনরি লামিন। এই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নেতাদের চোখে পড়েনি। কারণ টাকার কাছে সবই সম্ভব।

এছাড়া সদস্য নবায়নের নামে শাহ আলম স্বপন সকল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভর্তি ফি ২০ হাজার টাকা করে প্রায় ৩শ জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এছাড়া নবায়ন ফি ১ হাজার টাকা করে ২শ জনের কাজ থেকে নিয়েছেন।
সর্বশেষ স্বপন ও হেনরি লামিনের নেতৃত্বে তামাবিল পাথর আমদানীকারক গ্রুপের একটি কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটির সভাপতির স্থান পেয়েছেন পদবঞ্চিত বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম শাহ পরানসহ একদল আওয়ামীলীগ। এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীরা।
কমিটি গঠনের পূর্বে স্বৈরাচারের দোসর হেনরি লামিন ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারমান শাহ আলম স্বপন কৌশল অবলম্বন করে চলেছেন। তারা লুটপাটের বিষয় গুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গোয়াইনঘাটের স্থানীয় দুই সাংবাদিককে তামাবিল স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করেন। এতে করে সাংবাদিকরা নিরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে শাহ আলম স্বপন স্বৈরাচারের দোসর হেনরি লামিনকে স্থলবন্দর পরিচালনা করা দায়িত্ব দেন। এ দায়িত্ব নিয়েই হেনরি লামিন শুরু করেন ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাত ও চাঁদাবাজি।ফলে বাবসায়ীদের তোপের মুখে পড়ে হেনরি লামিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে শাহ আলম স্বপন তিনি নিজেই এই দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ তিনি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা। এনিয়ে ব্যবসায়ীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

শেয়ার করুন