৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২:১৩ অপরাহ্ণ
‘মুক্তিযুদ্ধের সুবর্র্ণজয়ন্তীর বছরে ও বঙ্গবন্ধু-জন্ম-শতবাষির্কী’ বন্দনায়-সমালোচনায় বঙ্গবন্ধুকে সঠিক মূল্যায়ন করা, করতে পারাই প্রধান কাজ। তাঁর জন্মশতবর্ষে অর্ধশত বৎসরের জীবৎ কালের অনেক কীর্তির কথা উল্লেখ করা যাবে। পাকিস্তান উপনিবেশের বিরুদ্ধে তাঁর লৌহ-কঠিন দৃঢ় আন্দোলন, চরম ডানপন্থী রাজনীতি থেকে স্বদেশী বাঙালিত্ব স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া, পশ্চিম পাকিস্তান অধিবেশন থেকে বের হয়ে আসা, প্রকাশ্য রাজপথে তর্জনী উঁচিয়ে পাকিস্তানিদের দেশ ছাড়ার চরমবাক্য শুনিয়ে দেওয়া, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে তোয়াক্কা না করা, ছয়দফার আল্টিমেটাম দেওয়া, পাকিস্তান সেনাদের রশদ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা, স্বাধীনতার পূর্বেই প্রকাশ্য রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব-পাকিস্তান স্থলে ‘বাংলাদেশ’ ব্যবহারের প্রস্তাব, বজ্রকণ্ঠে সাতই মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ, লাঠিসোটা নিয়ে পশ্চিমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘোষণা, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া, নির্ভীক গ্রেফতার বরণ, তথা বাংলাদেশ সৃষ্টি এসব দু:সাহসিক কাজই খোকা, মুজিবুর, শেখ সাহেব, শেখ মুজিব তথা বঙ্গবন্ধুর জীবনের অমূল্য কর্মকীর্তির মধ্যে পড়ে। অনেকে হয়তো তাঁর অনেক রকম অমূল্য কাজকে তাঁর জন্মশতবর্ষের প্রশস্তি আলোচনায় তুলে ধরবেন। আমি সবার ঊর্ধে উঠে তাঁর জীবনের সবচে’, সর্বাধিক অর্থবহ ও মূল্যবান কর্মকীর্তিটাকে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
যুগের তাড়নায় সমাজে নায়ক, ত্রাতার জন্ম হয়। আজি হতে শত বর্ষ আগের কথা টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামের সাধারণ মানুষের খোকা অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। গঁইগ্রাম টুঙ্গিপাড়া থেকে তাঁকে পারিবারিক সামাজিক রাজনৈতিক অনেক ঘাত প্রতিঘাত চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে যেতে হয়েছিলো। বাল্য সাথীরা দূরের কাছের আত্মীয় পরিজন পাড়া পড়শি হয়তো তখন ভাবতোই না তাঁদের খোকা একদিন সমাজ রাষ্ট্রকে ডিঙ্গিয়ে জাতির পিতার মর্যদায় অধিষ্ঠিত হবে।
বাল্যকাল থেকে খোকা খুব দুরন্ত, দু:সাহসিক ছিলেন। প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরে স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ ও ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। বিএ ক্লাসের ছাত্র থাকাকালীন ‘মুসলিম লীগ’র ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। মূলত বলতে গেলে এই সময়টা শেখ মুজিবের ও এ ভূখÐের জন্য সামাজিক রাজনৈতিক ধর্মীয় জীবনে এক গভীর সংকটকালীন সময় ছিলো। কেননা এই সময়টিই অখÐ ভারতে রাজনীতি শুরুর কাল। সাতচল্লিশ সাল। দেশভাঙ্গা ও নতুন দেশ গড়ার বিপদ-সঙ্কুল সময়। বিশেষ করে শেখ মুজিবের জীবনে রাজনৈতিক আদর্শ নির্ধারণে ‘অগ্নিপরীক্ষা’র কাল। জীবনের মাত্র সাতাশে সারাজীবনের সিদ্ধান্ত-কাল। একটু ভুলে সারাটা জীবনই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার শঙ্কা। অগত্যা সাম্প্রদায়িক জেনেও মুসলিম লীগের কর্মী হয়েই পরিচিত হওয়া ছাড়া কোন পথ খোলা নেই।
হক, ভাসানী, সোহ্রাওয়ার্দির চলাপথে তাঁদের ¯েœহধন্য অনুগামী চেলা শেখ মুজিব চরম ডানপন্থী মুসলিম লীগে’র কর্মী হয়েই নিজেকে প্রথমে নতুন দেশ ‘পাকিস্তান’ গঠনের কাজে নিয়োজিত করেন। তখনকার রাজনৈতিক চর্চায় এতবেশি নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী সমাজে ছিলো না। বলতে গেলে রাজনীতি কাকে বলে সমাজ তা জানতোই না। কেননা ‘অভিশপ্ত পাকিস্তান’ সৃষ্টির মাধ্যমেই ভারত উপমহাদেশে রাজনীতির শুরুর কাল ছিলো সেটা। বলতে গেলে সেটা ‘রাজনীতি শুরুর ঊষালগ্ন’, আর এ ভূ-খÐে শেখ মুজিব ছিলেন তৎকালীন উগ্র ডান পন্থী, ডান পন্থী ধারার রাজনীতির ‘ভোরের পাখি’।
সময়টা ছিলো ব্রিটিশ উপনিবেশের বিদায়, নতুনভাবে স্বদেশ, স্বাধিকার নিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনার যুগ। অত:পর অনাকাক্সিক্ষত, তবু একটি নতুন দেশ পেয়ে যাওয়া। এ সবই ছিলো অভাবনীয় দৃশ্য। তখন নতুন দেশে চললো নতুন নতুন রাজনৈতিক সামাজিক খেলা। শেখ মুজিব সেই নতুন মাঠে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়ার ও রাজনীতিক। কোনদিকে যান কোথায় কোনটায় স্থিত হলে কী হবে বুঝে উঠতে পারছিলেন না, বুঝে ওঠার মতো বয়সও হয়নি। ডান পন্থার নেতাদের কর্মকাÐ দেখে অসহ্য অথচ দাঁতে-দাঁত কামড়িয়ে শুধু টিকে থাকা আর সময়ের প্রতীক্ষায় ছিলেন। পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের ডিগবাজি দেখে ভীত, অজানার পথে পা বাড়াতে নিজের মন সায়ও দিচ্ছিলো না তবু কথা’ পথ তো একটা ধরতেই হবে। কিন্তু স্থির সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছিলেন, প্রতিনিয়ত ভাবছিলেন ‘ভুল করে ফেলছি না তো’ ? হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখা দিলো। ঊণপঞ্চাশের তেইশ জুন হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি ও মৌলানা ভাসানী মুসলিম লীগের পাশাপাশি সমান্তরালে একটি নতুন দল ‘পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করলেন। দিগি¦দিক চিন্তা না করে শেখ মুজিব ‘মুসলিম লীগ’ ছেড়ে একদমে তাতে যোগ দিলেন। মুসলিম লীগ ছেড়ে নতুন দলে যোগ দিতে পেরে শেখ মুজিব যেন হাফছেড়ে বাঁচলেন। নতুন নেতৃত্ব তবু দল প্রথম অবস্থাতেই তাঁকে দলের পূর্ব-পাকিস্তান অংশের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়ে ভূষিত করলেন।
‘সময় সমাসন্ন’ ! আটচল্লিশের তেইশে মার্চ প্রধম বছরই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ পূর্ব-পাকিস্তানে প্রথম সফরেই ঘোষণা করলেন ‘উর্দুই হবে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। দেশের দামাল ছেলেরা ইউনিভার্সিটির ছাত্রেরা তর্জনি উঁচিয়ে ‘মানি না, মানি না’ বলে চিৎকার করে উঠলো। শেখ মুজিবের কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক মূল-ধারার ক্ষীণ প্রভা চোখের সামনে যেন উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তিনি এটাকে ধরেই ঘুণেধরা আটপৌঢ়ে রাজনীতির লাইন পরিত্যাগ করার পথ পেয়ে গেলেন। শেখ মুজিব এর পর পরই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় সভায় মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করেন। পরবতীতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও পরিষদের আহŸানে এগারোই মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালন করা হলো। পনেরো মার্চ গ্রেফতারকৃত ছাত্র নেতাদের মুক্তির পর শেখ মুজিবের সভাপতিত্বে এক সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন।
শুরু হয়ে গেলো এ ভূখÐে মূল রাজনীতি, ‘ভাষা রক্ষার রাজনীতি’। মুজিব সর্বান্তকরণে ঝাঁপ দিলেন এই নতুন পথে। সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ দিয়ে যে নেতার রাজনীতির হাতেকড়ি নতুন দিশায় এই নেতা এক মুহুর্তে হয়ে উঠলেন বাঙালির নেতা মনেপ্রাণে ধারণ করে নিলেন বাঙালিত্বের দীক্ষা। তারপরে তাঁর জীবনের যত আন্দোলন যত কর্মকাÐ সবটুকুই বাঙালি, বাংলাদেশ বিনির্মাণের আন্দোলন। আর এখানেই শেখ মুজিবের স্বাজাত্যবোধের চেতনা জাগ্রত হয়। সেই থেকেই শুরু হলো মুজিবের জীবনে ‘কারাবন্দী’ হবার পালা। এই নতুন পথে পথচলার সামান্য ছ’বছরেই এই যুবনেতাকে সাতবার বন্দী, নজরবন্দী হতে হয়েছে। আশার দিক হলো ইতোমধ্যেই নতুুন পূর্ব-পাকিস্তান সমাজের মানুষ আজীবন লালিত দু:স্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে জেগে উঠতে লাগলো। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নিজেদের মাঝে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে স্বপ্নাচ্ছন্ন হতে লাগলো। নতুন নেতাকে ধীরে ধীরে আপন করে নিতে শুরু হলো, জনসম্পৃক্তি বাড়তে লাগলো। নতুন দেশে রাজনীতির মোড় দ্রæত গতিতে নদীর বাঁকের মতো পাল্টাতে লাগলো নতুন নতুন পথ এসে দেখা দিতে লাগলো, মোহনায় শামিল হতে লাগলো। সেই সাথে বিপদও আসতে থাকলো সমান তালে তা হলো লোভনীয় মন্ত্রীত্বের পদ. ক্ষমতার স্বাদ।
আটচল্লিশেই শেখ মুজিব ‘যুব লীগ’-এ যোগদান করেছিলেন এবারে নিজের মতো করে ‘ছাত্র লীগ’ গঠন করে ছাত্রদের মাঝে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করতে প্রয়াস পেলেন। বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব মনোনিবেশ করার প্রাক্কলেই তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। বায়ান্ন সালেই সমাজতান্ত্রিক চীনের ‘তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’ ও ‘এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন’-এ আমন্ত্রিত হয়ে ত্রিশ সদস্যের পাকিস্তান প্রতিনিধি দল নিয়ে পিকিংয়ে যোগ দেন। এই সফরের পর শেখ মুজিব সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি বিশ^াস করতে শুরু করেন মানুষের সার্বিক দু:খ দুর্ভোগ দূর করতে, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সমাজতন্ত্রের বিকল্প নাই।
ইতোমধ্যেই পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমায় অনেক জল গড়িয়ে গেলো—–। তিপ্পান্ন সনে নয় জুলাই ‘মুসলিম লীগে’র এক কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হলো। চুয়ান্নতে এ কে ফজলুল হক তাঁর ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’ ও দেশের অপরাপর দল মিলে মুসলিম লীগের সাথে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নামতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করলেন। অন্যান্য দলের আপত্তি সত্বেও আওয়ামী মুসলিম লীগ এই ফ্রন্টে যোগদান করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলো। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জ আসনে নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী মুসলিম লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে দশ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তানের দু’শ তিয়াত্তরটি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো, মাত্র পঞ্চাশটি আসন পেলো। যুক্তফ্রন্ট পেলো দু’শ তেইশটি আসন, এতে এ ভূখÐের মানুষের নিজেদের প্রতি বিশ^াস ফিরে এলো। কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগ একাই পেয়েছে এক শ’ তেতাল্লিশটি আসন তাতে এই নতুন দল ও নেতৃত্বের প্রতি দেশের মানুষের মনোভাব প্রথম বারের মতো যাচাই করা সম্ভব হলো। ওদিকে এই প্রথম মুসলিম লীগকে পূর্ববাংলার মানুষ তাঁর স্বরূপ চিনিয়ে দিতে পেরে আত্মপ্রসাদ লাভ করলো। চুয়ান্নর তেসরা এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। পনেরো মে মূখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক শেখ মুজিবকে শপথ গ্রহণ করিয়ে তাঁকে তার মন্ত্রীসভায় কৃষি ও বনমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেন। পঞ্চান্নর একুশ থেকে তেইশ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের এক বিশেষ অধিবেশনে দলের সদস্যদের সর্বসম্মত ভোটে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। পাকিস্তান সরকার পূর্ব-পাকিস্তানের সংসদ ভেঙ্গে দিলে এ দেশের রাজনীতিতে নতুন বাঁক সৃষ্টি হয়। শুরু হলো এ ভূখÐের স্বায়ত্ত¡শাসন, স্বাধীনতা নিয়ে নানা সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা। এদিকে শেখ মুজিব ‘মন্ত্রীত্ব’, ‘পূর্ব-পাকিস্তান চা বোডের্’র দায়িত্বে ইস্তাফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনই ‘দল’কে সারাদেশে গ্রহণযোগ্য ও জাতীয় দলে পরিণত করতে নতুন কর্মোদ্যম গ্রহণ করলেন। এরই মাঝে মুজিবের পদের প্রতি নির্লোভ মনোভাব ও আত্মত্যাগ দলের কর্মী-শুভানুধ্যায়ীদের মনে বিশ^াস ও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করলো। শুরু হলো জেলায় জেলায় শেখ মুজিবের সভা-সমাবেশ, পাশাপাশি থাকলো মৌলানা ভাসানীর ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পাটির্’ (ন্যাপ)। দেশে রাজনৈতিক দল বলতে এ দু’টিই ছিলো, মুসলিম লীগ আর আগের অবস্থানে ফিরতে পারলো না ক্ষীণ হতে হতে প্রায় শূণ্যের কোঠায় অবস্থান করলো।
এ লেখাটি এখানে শেষ করে দিলেই হতো। তবু ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির উদ্ভবকালটার একটু আলোকপাত করার জন্যই শেখ মুজিবের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা তুলে ধরতে হয়। উনিশ শ’ বাষট্টি, চৌষট্টি’র আন্দোলন ছিলো ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে’র নানা কর্মসূচি, তার মাঝে শেখ মুজিবের ছিষট্টির ‘মেঘনাকার্টা’ ‘ছয় দফা’র আন্দোলনই পরবর্তী মুক্তিসংগ্রামকে সামনে এনেছিলো। ঊণসত্তুরের মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কেন্দ্রীয় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে আন্দোলনটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এটাই ‘ঊণসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান’। ঊণসত্তুরের তেইশে ফ্রেব্রæয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করলো। সেখানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে ‘জনতা’ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। টুঙ্গিপাড়ার খোকা’র নাম হয়ে গেলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনই বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের এগারো দফা আন্দোলনের পক্ষে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করলেন। পাঁচ ডিসেম্বর এই সোহরাওয়ার্দি উদ্যানেই (পুরাতন রেসকোর্স ময়দান) সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুবার্ষিকীর জনাকীর্ণ সভায় শেখ মুজিব ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ স্থলে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করার প্রস্তাব ব্যক্ত করেন। প্রস্তাবটি জনমনে ব্যাপক গুঞ্জন সৃষ্টি করে ও সাড়া জাগায় এবং পরবর্তী বাজনৈতিক সামাজিক চিন্তা চেতনায় বিষয়টি নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে। জনতা পরবর্তী স্বাধীনতার আন্দোলন, ‘নতুন নামে দেশ’র অভ্যুদয়ের ইঙ্গিত পেয়ে যায়। এই ঘটনার পর তাঁকে পাকিস্তান সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখ্যায়িত করে। এই মৃত্যুবার্ষিকীর সভা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার গণআন্দোলন, শেখ মুজিবের সংবর্ধনার জনসমাবেশের চিত্র দেখে আইয়ুব খান ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তান চলে যায়।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর জীবনের নানা বর্ণাঢ্য ঘটনার মাঝে একটি ঘটনা বা সিদ্ধান্তকেই চরম বলে মেনে নিতে হয়। চরম ডানপন্থী উগ্রধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দিয়ে জীবনে রাজনৈতিক পথচলা শুরু করে স্তরে স্তরে পরিবর্তনের শিখরে ওঠে মনেপ্রাণে তাঁর বাঙালি হওয়া। বাঙালি স্বাজাত্যবোধে ফিরে আসতে পারাটাকেই তাঁর বিশেষ কীর্তি বলে মনে করি। এই বঙ্গভূমিতে জন্মে যে যতই অমানিশার অতল গহŸরে চাপা পড়–ক বাঙালি মন তাঁকে শেকড়ের দিকে টানবেই। বঙ্গবন্ধু সে টান অনুভব করেছিলেন, তাই ফিরে এসেছিলেন বাঙলা মায়ের কোলে। তাঁর জন্মশতবর্ষে তাঁকে শত কোটি সালাম, স্যালুট ও জানাই অন্তর নিঙরানো অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
আজো মনে কষ্ট জাগায়, কান্না পায়, বুকটা হুহু করে ওঠে সেই গানটির কলি যখন কানে বেজে ওঠে———-‘ যদি রাত পোহালেই শোনা যেতো,
বঙ্গবন্ধু মরে নাই
——–বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, মুক্তি চাই’।
#————+————–#
লেখক : সাবেক সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সুনামগঞ্জ পৌর ডিগ্রি কলেজ, সুনামগঞ্জ। তারিখ : ৩০ নভেম্বর ২০২১ ইং মঙ্গলবার।