30 September 2026, 8:23 PM
Gear Front Side In White Background
তারুণ্যের একটি ট্রেন্ড হচ্ছে ‘ই-সিগারেট’। এর স্টাইলিশ ব্যবহার সহজেই আকৃষ্ট করে তরুণদের। ই-সিগারেট বা ইলেকট্রনিক সিগারেট হলো একটি ব্যাটারিচালিত যন্ত্র, যা তরল পদার্থ গরম করে ধোঁয়ার মতো বাষ্প বা অ্যারোসল তৈরি করে। একে ভ্যাপ বা ভ্যাপিং ডিভাইসও বলা হয়।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেট টোব্যাকো পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। অনেকে সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ই-সিগারেট বা ‘ইলেকট্রনিক সিগারেট’ ব্যবহার করেন। তারা মনে করেন ই-সিগারেট ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে সাহায্য করে। ধূমপায়ীরা মনে করেন যে, ‘ই-সিগারেট প্রচলিত সিগারেটের বিকল্প, ধূমপান ত্যাগে কার্যকর। সবচেয়ে বিভ্রান্তির কথা হলো, ই-সিগারেট কম ক্ষতিকর।’
বর্তমানে তরুণ-তরুণীরা ধূমপান শুরুই করছেন ই-সিগারেট দিয়ে। ডব্লিউএইচও এর ২০২১ সালের তথ্য মতে, বাজারে ১৬ হাজার ধরনের স্বাদ/গন্ধযুক্ত (ফ্লেভার) ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস রয়েছে। আপেল, স্ট্রবেরি বা চকলেটের মতো বিভিন্ন সুগন্ধিযুক্ত এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে ই-সিগারেটের প্রতি তরুণ-তরুণীদের আকর্ষণ বেশি দেখা যায়। অল্পবয়স থেকেই ধূমপান শুরু করার ফলে মুখগহ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে এর কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ সিগারেটের চেয়েও ক্ষতিকারক। ই-সিগারেটের তরল মিশ্রণের (ই-লিকুইড) মধ্যে থাকে প্রপেলিন গ্লাইসল, গ্লিসারিন, পলিইথিলিন গ্লাইসল, নানাবিধ ফ্লেভার এবং নিকোটিন। গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রাসায়নিকগুলো থেকে সাধারণ সিগারেটের ধোঁয়ার সমপরিমাণ ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়। এ ছাড়া ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে অতিসূক্ষ্ম রাসায়নিক কণা যা ভীষণ ক্ষতিকারক। এর থেকে গলা-মুখ জ্বালা, বমিভাব এবং কাশি দেখা দিতে পারে।
এছাড়া ই-সিগারেটের প্রধান উপকরণ নিকোটিন থেকে দ্রুত আসক্তি তৈরি হয়। যা থেকে ফুসফুসের বিভিন্ন অসুখ হতে পারে। অতিরিক্ত নিকোটিন ব্যবহারের ফলে মৃত্যুও হতে পারে। এর ধোঁয়ায় এমন কিছু উপাদান আছে যেগুলো থেকে ক্যানসার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ই-সিগারেট দশগুন বেশি ক্ষতিকারক।
সিগারেটে অতিরিক্ত নিকোটিন থাকায় দীর্ঘমেয়াদের জন্য মস্তিষ্কের কোষে গভীর আসক্তি তৈরি করে। যা পরবর্তিতে স্বাভাবিক উদ্দীপনা, মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা, স্মৃতিশক্তি ও মনযোগ কমে যাওয়া ও চিন্তা করার ক্ষমতাকে বাধা প্রদান করে। যার ফলে ধূমপান বাদ দিলে খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেট বা নিকোটিনের আসক্তি থেকেই অনেক সময় তরুণরা পরবর্তীতে আরও মারাত্মক মাদকের আসক্তিতে জড়িয়ে পরে। শিক্ষার্থীরা পকেটমানির একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় এই বদভ্যাসে অপচয় করে। আধুনিক বা স্মার্ট দেখানোর ফ্যাশন হিসেবে ধূমপান শুরু করলেও পরবর্তীতে এটি সামাজিক ও পারিবারিক সুসম্পর্ক নষ্ট করে।
ই-সিগারেট এখন তরুণ-তরুণীরা লাইফ স্টাইলের একটা অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে। ই-সিগারেট এবং ভ্যাপিং এর ব্যবহার তরুণ এবং যুব সমাজের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আগামী প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। সবচেয়ে বড় কথা, ই-সিগারেট দিয়ে ধুমপান কখনো ছাড়া যায় না। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধূমপান ও সিগারেটের প্রভাব শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। সন্তাদের ছোটবেলা ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝাতে হবে। যাতে বড় হয়ে তারা ধুমপানের দিকে না ঝুকে। সন্তানরা কাদের সাথে মিশছে সেদিকে নজর রাখা এবং অবসর সময়ে খেলাধুলা, বইপড়া, সৃজনশীল কাজ ও শারীরিক ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে। কিশোর বয়সে সন্তান যাতে খারাপ সঙ্গ বা কৌতূহলের বশে ধূমপান শুরু না করে অভিভাকদের সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সন্তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।
নতুন করে যেন কোনো শিশু-কিশোর কিংবা উদ্বেলিত তরুণ-তরুণী মাদকের জালে জড়াতে না পারে, তারা যেন কৌতূহল কিংবা এক্সপেরিমেন্টেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে এবং বন্ধুবান্ধব নির্বাচনে যেন সজাগ থাকে, এ জন্য মাদকের পরিণতি সম্পর্কে আগেই খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। শুধু আইনি ব্যবস্থাপনায় মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু করে সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
লেখক: তথ্য সহকারী, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট